রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয়িত অর্থের একটি বড় জোগান নানাবিধ কর। দেশের মানুষের প্রদেয় ‘কর’ই ব্যয় হয় দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে। দেশের অর্থনীতিও সুদৃঢ় হয় আহরিত করের ওপর নির্ভর করে। সকল দেশের অর্থমন্ত্রীদেরই রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায় আয়ের উত্স সন্ধান করতে, আয়ের বহর বাড়াতে। আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রীও দেশের বিশাল অঙ্কের বাজেটের জোগান মেটাতে নতুন নতুন খাত বেছেছেন, বিদ্যমান খাতে হেরফের করেছেন। আর এই প্রক্রিয়ায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর প্রদেয় উত্স কর ৫ শতাংশ হতে বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশ করেছেন। আগেও ১০ শতাংশ ছিল। ২০১৬-১৭ এর বাজেটে তা নামিয়ে আনা হয়েছিল ৫ শতাংশ হারে। অর্থাত্ তিন বছর আগে যে সঞ্চয়কারীরা তৃপ্তির হাসি হেসেছিলেন তারা এখন বিষণ্ন হয়েছেন আরো বেশি।
বাংলাদেশে চার প্রকারের সঞ্চয়পত্র প্রচলিত আছে। (১) পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, (২) তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, (৩) পরিবার সঞ্চয়পত্র ও (৪) পেনশনার সঞ্চয়পত্র। এই চার প্রকারের সঞ্চয়পত্রের মধ্যে প্রথম দুটি যে কেউ ক্রয়ের অধিকারী হলেও পরিবার সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ক্রেতা নির্দিষ্ট করা রয়েছে। পরিবার সঞ্চয়পত্র ক্রয় করতে পারেন কেবলমাত্র ১৮ ও তদূর্ধ্ব বয়সের যে কোনো বাংলাদেশি নারী, যে কোনো বাংলাদেশি শারীরিক প্রতিবন্ধী (পুরুষ ও নারী) এবং ৬৫ ও তদূর্ধ্ব বয়সের বাংলাদেশি (পুরুষ ও নারী) নাগরিক। এই সঞ্চয়পত্রের একক নামে সর্বোচ্চ ক্রয়ের সীমা ৪৫ লাখ টাকা। জনপ্রিয় এই সঞ্চয়পত্রটি একসময় বন্ধ হয়ে গেলে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে নারীদের ভাগ্যোন্নয়নের স্বার্থে ২০০৯ সালে সঞ্চয়পত্রটি পুনর্প্রবর্তন করে।
আরেকটি জনপ্রিয় সঞ্চয় কার্যক্রম পেনশনার সঞ্চয়পত্র। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/ কর্মচারী, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত মাননীয় বিচারপতিগণ, সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এবং মৃত চাকরিজীবীর পারিবারিক পেনশন সুবিধাভোগী স্বামী/ স্ত্রী/ সন্তানগণই কেবল এই সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের অধিকারী। অবসরকালে প্রাপ্ত আনুতোষিক ও ভবিষ্যত্ তহবিলের অর্থ মিলিয়ে একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ক্রয় করা যায়।
সরকারের নানানিধ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি হয়েছে নারী, বৃদ্ধ ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের আবর্তন করে। বর্ণিত পরিবার সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্র অনেকাংশে সেই গোষ্ঠীরই স্বার্থ দেখে থাকে। পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ক্রেতাদের বয়স প্রায় সবারই ৬০ ঊর্ধ্ব। ৬০ ঊর্ধ্ব ছাড়া যারা আছেন তারা মৃত চাকরিজীবীর পরিবারের স্বামী/স্ত্রী/সন্তান, যারা আরো বেশি অসহায়।
২০১৫ সালের ১ জুলাইয়ের পরে যারা পেনশন পেয়েছেন তারা তুলনামূলকভাবে ভালো হারে পেনশন/আনুতোষিক পেলেও তাদের আগে যারা পেনশন পেয়েছেন তাদের সঞ্চয় এমনিতেই অনেক কম। সর্বোচ্চ সীমার পেনশনার সঞ্চয়পত্রের অধিকারী বর্তমানে প্রতি তিন মাস অন্তর সাকুল্যে ১৩৯,৬৫০/- টাকা মুনাফা পেয়ে থাকেন। বাজেটে ঘোষিত উেস কর কর্তন ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে প্রাপ্ত মুনাফার পরিমাণ হবে ১৩২,৩০০/- টাকা। প্রতি তিনমাসে আয় হ্রাস পাবে ৭,৩৫০/- টাকা অর্থাত্ প্রতি মাসে ২৪৫০/- টাকা। ঠিক তেমনি করে হ্রাস পাবে পরিবার সঞ্চয়পত্রের আওতায় নারী, প্রতিবন্ধী ও ৬৫ ঊর্ধ্ব সিনিয়র সিটিজেনদের।
মুদ্রাস্ফীতি, নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, প্রভৃতি নানা কারণে পেনশনার ও মহিলা সঞ্চয়কারী ব্যয় এমনিতেই বাড়ছে। তাদের আয়ের উত্স বলতেই সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পেনশন। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমে যাওয়ায় এই শ্রেণিকে পড়তে হবে অধিকতর দুর্দশায়।
প্রান্তিক বিনিয়োগকারীদের দুর্দশা বিবেচনা করেই ২০১৬ সালের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের উত্স হতে কর্তন ১০ শতাংশ হতে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছিল। জনমনে প্রত্যাশা ছিল সেই একই বিবেচনায় এবারে সঞ্চয়পত্রের আয়ে উত্স হতে কর্তন রহিত হতে পারে কিংবা রহিত না হলেও ২.৫ শতাংশ এ নেমে আসতে পারে।
জনহিতকর কাজের জন্য বর্তমান সরকারের নিকট সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারী স্বল্প আয়ের মানুষ আশা করতেই পারে, সরকার তার সুবিবেচনায় সঞ্চয়পত্রে, বিশেষ করে পরিবার ও পেনশনার সঞ্চয়পত্র হতে উেস আয় কর কর্তনের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেবে। হাজার হাজার নারী, প্রতিবন্ধী ও সিনিয়র সিটিজেনদের মুখে ফোটাবে হাসির আভা।
n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
