প্রথমে উল্লেখ করতে চাই পশু-পাখি আর জংলিদের আচরণ ও অবস্থানের কথা। এদের শিক্ষাদীক্ষা নেই, এরা পশু বলেই আমরা বলে থাকি যে এরা চারপায়া জানোয়ার। এদের আচরণ খারাপ হয় বলেই এরা পশু। এরা মানব কিংবা মানুষ নয়। আর মানুষ জগত্ জুড়ে তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ ঘটিয়েছে বলেই তারা মানব কিংবা মানুষ। অবশ্য তাদের আচরণবিধি একান্তই মানবীয় হওয়া উচিত। যখনই মানুষের আচরণ অমানবীয় হয়ে ওঠে, তখনই তাদের আর মানুষ বলা হয় না। যখনই কেউ দেখে একটি মানুষের আচরণবিধি মানবতা কিংবা মানব-আচরণের বাইরে, তখন মানুষকে তার খারাপ আচরণের দিকে ধাবিত হয় তখন সে হয় এক নরপশু। মানে মানব নামের এক পশু সে।
বোঝা গেল, মানুষ যখন তার আচরণবিধি লঙ্ঘন করে মানবতার আচরণ ছেড়ে অন্য খারাপ আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় তখন তাকে পশু সম্বোধন করা হয়। তাহলে আমরা মানুষ হলাম এই জন্য যে, আমাদের আচরণ হবে মানবীয় আচরণ। মানুষ বিশ্ব সৃষ্টির জগতের সেরা জীব। যাকে বলা হয় ‘আশরাফুল মাখলুকাত’। আমাদের আচরণবিধি ও মানবতার কারণে আমরা মানুষ হয়ে শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে আজও বেঁচে আছি মানবতা আর শান্তির ঝান্ডা হাতে। আচরণবিধি আর শিক্ষাদীক্ষা আমাদের করেছে মহান। আজকে এবং বিশ্ব সৃষ্টির শুরু থেকে এই জাতি রেখেছে তার মহত্ত্ব ও সম্মান।
এই ছোট্ট জীবনে বিশ্বের অনেক দেশ ঘোরার সৌভাগ্য হয়েছে। বিশেষ করে এই এশিয়ার বহু দেশে বহুবার যাওয়া হয়েছে। বারবার যাওয়া হয়েছে আমাদের পার্শ্ববর্তী বৃহত্ দেশ ভারতে। গত প্রায় দুবছর যাবত্ ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সুবাদে অন্তত প্রতি মাসে কলকাতা ও দিল্লি হয়ে চলাচল করতে হয়েছে আমার সেখানে। কখনো উড়োজাহাজে কখনো-বা রেলপথে। এত সব মানুষ চলার পথে আমার সাক্ষাত্ মিলল যা হিসাব রাখা বড়ই মুশকিল। চলার পথে বহুবার ধাক্কাও লেগেছে কারো কারো সঙ্গে। যখনই বলেছি ‘সরি ব্রাদার’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাকে হাসিমুখে উত্তর দিয়েছেন ‘ইটস ওকে’ অন্যদিকে আমাদের দেশে যদি এর ব্যতিক্রম দেখি। তখন মনটা কষ্ট পায়। আমাদের দেশে গাড়িতে চলার পথে যখন দেখি একটি প্রাইভেট কারের ড্রাইভার কিংবা একটি বাস ড্রাইভার অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে একটি রিকশাওয়ালাকে, আবার বিপরীত দিকে সেই রিকশাওয়ালাটিও ওদের মা-বাবা তুলে বকুনি দিতে থাকে, তখন ভাবনায় পড়ে যাই, কোথায় হারাল আজ মানবমন আর মানবতার সুস্থ আচরণ। ঠিক অন্যদিকে যখন দেখি ভারতের ড্রাইভার কিংবা অটোচালকের সুন্দর আচরণ, দেখি তাদের সৌহার্দ্যের মিতালি তখন ধিক্কার দিতে মন চায় নিজেকে।
দেশটি স্বাধীন হয়েছে আজ প্রায় আটচল্লিশ বছর আগে। যাঁরা তাজা রক্ত উত্সর্গ করে দেশটি স্বাধীন করেছিলেন তাঁরা তো আমাদের পিতা কিংবা ভাই। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল বড়ই মহত্। তাঁরা তো চেয়েছিলেন পাকিস্তানি হানাদারদের তাড়িয়ে স্বাধীন সার্বভৌম এই রাষ্ট্রটি নতুন আঙ্গিকে নতুন জাতিসত্তা নিয়ে ভোগ করবে এক অনাস্বাদিতপূর্ব শান্তির জীবন। তাই আমাদের ছাত্রদেরকে মানবতার কিছু কথা বলে নিজে নিজে বড়ই তৃপ্তি পাই।
আমরা মানুষ। মানবতা বা আচরণবিধি মানুষের সুষ্ঠু ও সুন্দর চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। মানব বা মানুষ হিসেবে আমাদের আচরণবিধি হওয়া উচিত মানবীয় ও মহান। আর তা হতে হবে পশুর চরিত্রের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের আচরণ অবশ্যই হতে হবে সুন্দর ও চরম উন্নততর। আসুন, সকলকে মানবতার কথা বলতে শেখাই। আসুন আমরা সকলে মিলে সুন্দর আচরণবিধি দিয়ে জয় করি আমাদের স্বাধীনতার মহত্ উদ্দেশ্য। তবেই আমরা হতে পারব বিশ্বের অন্য দশটি দেশের মতো আরো উন্নত ও সফল জাতি।
n লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও মানবাধিকার কর্মী
