ঢাকাকে যানজটমুক্ত করতে নয় বছর আগে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল দূরে সরানোর প্রস্তাব করা হয়। ২০১০ সালে সায়েদাবাদ টার্মিনাল কাঁচপুর সেতুর পাশে, ফুলবাড়িয়াকে কেরানীগঞ্জে, মহাখালীকে উত্তরায় ও গাবতলী টার্মিনাল সাভারে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা করা হয়। এ জন্য তত্কালীন ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) রাজউকের কাছে জমিও চেয়েছিল। রাজউক জমি খোঁজা শুরু করেছিল। কিন্তু তা আর কার্যকর হয়নি। বরং বাস কোম্পানীগুলো পাল্লা দিয়ে পুরো ঢাকায় টিকেট কাউন্টার বসিয়েছে। টিকেট কাউন্টারগুলো আগে টার্মিনালের আশপাশের এলাকায় থাকলেও এখন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো শহরে। দূরপাল্লার বাসগুলো রাতে এসব কাউন্টার ঘুরে যাত্রী তোলে। ফলে দিনের মতো রাতেও ঢাকায় যানজট সৃষ্টি হয়।
এছাড়া নানা সমস্যায় জর্জরিত রাজধানীর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলো। অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতার কারণে যাত্রীদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এর উপর হকার-দালাল ও পকেটমারের উত্পাত তো আছেই।
ঢাকার যানজটের একটা বড় কারণ মূল শহরের মধ্যে বাস টার্মিনাল থাকা। এক সময় ঢাকার একমাত্র বাস টার্মিনাল ছিল ফুলবাড়িয়ায়। ১৯৮৪ সালের ডিসেম্বরে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়। তিন ভাগ করে সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালীতে বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করা হয়। তখন সেগুলো মূল শহরের কিছুটা বাইরে হলেও এখন শহর বেড়েছে, বেড়েছে লোকজন। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পরিবহনের সংখ্যা। ফুলবাড়িয়াতে টার্মিনাল না থাকলেও সেখানে পরিবহন কোম্পানিগুলোর টিকিট কাউন্টার রয়েছে। আবার মাওয়াগামী পরিবহনগুলো অধিকাংশ ফুলবাড়িয়া থেকে ছাড়ে। এসব টার্মিনালগুলোর কারণে গাবতলী, আমিনবাজার, আশুলিয়া সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, ফুলবাড়িয়া, মহাখালীসহ ঢাকা থেকে বের হওয়ার পয়েন্টগুলোতে দিনে ও রাতে যানজটের সৃষ্টি হয়। বাসগুলো টার্মিনাল ছাড়িয়ে রাজধানীর প্রধান সড়কের উপর অবৈধ স্ট্যান্ড তৈরি করেছে। দূরপাল্লার বাসগুলো টার্মিনালকে গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহার করছে। টার্মিনালে থাকা বাসগুলোর বেশিরভাগই থাকে যান্ত্রিক ত্রুটি। টার্মিনালে চলে মেরামতের কাজ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীজুড়ে দূরপাল্লার পরিবহন প্রতিষ্ঠানের টিকিট কাউন্টার গড়ে উঠেছে। শুধু সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের বাইরেই আশপাশে রয়েছে চার শতাধিক কাউন্টার। ফলে বাস টার্মিনালগুলোও বিস্তৃত হয়েছে। সায়েদাবাদ টার্মিনাল যাত্রাবাড়ী ও গোলাপবাগ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। গাবতলী টার্মিনাল টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজগেট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সাথে গাড়ি পার্কিং, স্ট্যান্ড এবং টিকিট কাউন্টারও গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে কলাবাগান, আসাদগেট, মালিবাগ, আরামবাগ, বাড্ডা, উত্তরা, মিরপুর, মতিঝিল, ধানমন্ডির মতো ব্যস্ত এলাকায়ও গড়ে উঠেছে বাস কাউন্টারগুলো। বর্তমানে সায়েদাবাদ টার্মিনাল কেন্দ্রিক প্রায় আড়াই হাজার বাস দেশের দেড়শ রুটে চলাচল করছে। বাসগুলো টার্মিনাল ব্যবহার করলেও প্রধান সড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করে। তাই এসব টার্মিনালের কারণে অনেক সময় ঢাকায় ঢোকার পথও বন্ধ হয়ে যায়।
টার্মিনালগুলোর নোংরা পরিবেশের কারণে অনেক যাত্রী টার্মিনাল থেকে বাসে উঠতে চান না। তারা বিভিন্ন টিকিট কাউন্টারের সামনে থেকে বাসে ওঠেন। যাত্রীরা বলছেন, টার্মিনালে গেলেই আতঙ্কে থাকতে হয়। পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকজন টানাহ্যাঁচড়া শুরু করে দেয়। আবার দালাল ছাড়া টিকিট পাওয়া যায় না। টিকিট কাটার পর বকশিশের নামে চাঁদাবাজি তো আছেই। সবকিছু মিলিয়ে বাসটার্মিনালগুলো এখনো যাত্রীবান্ধব হয়ে ওঠেনি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পরিবহন শাখার মহাব্যবস্থাপক লতিফ খান বলেন, বাসটার্মিনাল যাত্রী বান্ধব করতে আমরা সার্বক্ষণিক নজর রাখি। আমরা মাঝে মাঝে বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেই।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ডিএনসিসি এলাকায় নতুন করে বাস টার্মিনাল করার পরিকল্পনা নাই। কারণ টার্মিনাল করার পর্যাপ্ত জায়গা নাই।
