সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তে সোমবার ভোরে যে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে তাতে সিরীয় অংশের বাসিন্দারা বেশি বিপাকে পড়েছে। শুক্রবার পর্যন্ত সেখানে মৃতের সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজার বলে জানা গেছে। বহু মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা রয়েছে। সংখ্যাটি যদিও তুরস্কের ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় অনেক কম (একই সময় তুরস্কে মৃতের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়, রবিবার পর্যন্ত এই সংখ্যা ২৪ হাজারে পৌঁছে) কিন্তু সিরিয়ার বাসিন্দাদের অবস্থা তুরস্কের চেয়ে অপেক্ষাকৃত শোচনীয়। তুরস্কে ব্যাপক এলাকা ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু ভূমিকম্পদুর্গতদের পাশে রয়েছে তাদের সরকার থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। সিরিয়ার ব্যাপারটা সেরকম নয়। সেখানে সরকারই ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের প্রতিপক্ষ। এছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও তাদের উপক্ষো করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধ-বিগ্রহ অনেকটা থেমে গিয়েছিল। হঠাৎ এই ভূমিকম্প স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন প্রায় লন্ডভন্ড করে দেয়। বলা হচ্ছে, গত ১০০ বছরে এত ভয়াবহ ভূমিকম্প আর হয়নি। এবার ভূমিকম্পের পর আফটারশক হয়েছে অনেকক্ষণ ধরে। যে কারণে প্রাণহানির সংখ্যা হয়েছে বেশি। সিরিয়ার যে অংশে ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে সেখানে বেশির ভাগ যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত লোকজন বাস করে। অঞ্চলটি আগে থেকেই মানবিক সংকট জর্জরিত ছিল। সেখানকার ৪৫ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখই যুদ্ধে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। এটি সিরিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ শতাংশ। ঐ অঞ্চলের ৬৫ শতাংশ মৌলিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। বেশির ভাগ মানুষ মূলত বৈদেশিক ত্রাণসহায়তার ওপর নির্ভরশীল। অঞ্চলটি বিদ্রোহী গ্রুপ সিরিয়ান ডিফেন্স ফোর্স (এসডিএফ) নিয়ন্ত্রিত। তাই সরকার সেখানে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর উদ্যোগ নেয়নি। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ভূমিকম্পে সিরিয়ায় নতুন করে উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৫০ লাখ বাড়তে পারে।
তুরস্কের বাব আল হাওযা সীমান্ত চেক পয়েন্ট দিয়ে জাতিসংঘের উদ্যোগে মানবিক সহায়তা সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পাঠানো হয়। সীমান্তের ভেতর আরো কিছু চেক পয়েন্ট পার হয়ে অভাবগ্রস্ত মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়। গৃহযুদ্ধ বিধ্বস্ত সিরিয়ার পুরোটা বাশার আল আসাদ সরকারের নিয়ন্ত্রণে নাই। বিদ্রোহীদের বিভিন্ন গ্রুপকে আবার নিয়ন্ত্রণ করে বাইরের বিভিন্ন দেশ। ভূমিকম্পের পর সীমান্তের সবগুলো ক্রসিং পয়েন্ট বন্ধ আছে। কারণ, ভূমিকম্পের পর অনেক রাস্তা ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে কঠিন সংকটে পড়েছে সিরিয়ার ভূমিকম্প উপদ্রুতরা। একদিকে ভেঙে পড়া বাড়িঘরের নিচ থেকে এখনো সবাইকে উদ্ধার করা হয়নি, অন্যদিকে এই বিপদগ্রস্ত মানুষগুলো প্রচণ্ড শীত ও মানবিক সহায়তা ছাড়াই সময় পার করতে হচ্ছে। কারণ উদ্ধারকারী দল তাদের কাছে যেতে পারছে না। প্রতি মিনিটে সেখানে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিরিয়া সিভিল ডিফেন্স (এস সি ডি) সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কাজ করে। এদের সদস্য সংখ্যা ৩ হাজারের মতো যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। সংগঠনটির আরেকটি নাম হোয়াইট হেলমেটস। ২০১৪ সাল থেকে তারা কর্মরত আছে। যুদ্ধ-সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের সহায়তা করার অভিজ্ঞতা থাকলেও তাদের ভূমিকম্প উপদ্রুত এলাকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই। ঐ অঞ্চলে ও তার আশপাশে জাতিসংঘের ৯০০ শান্তিরক্ষী কর্মরত আছে। তবে তাদেরও সরঞ্জামাদি ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। ভূমিকম্পের পর কীভাবে উদ্ধার তত্পরতা চালাতে হয় সেটি বিবেচনা করে তাদের পাঠান হয়নি। এসডিএফ বলেছে তারা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে উদ্ধার তৎপরতায় সহযোগিতা করবে। তবে এসডিএফ ও হোয়াইট হেলমেট বলেছে, সরঞ্জামাদির অভাবে তারা ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার তত্পরতা চালাতে পারছে না। এর বাইরে সরকার নিয়ন্ত্রিত আলেপ্পো, হামা ও ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী অব্জলও ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে রাশিয়া, ইরাক, আলজেরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
আসাদ সরকার ভূমিকম্প উপদ্রুতদের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়েছে। ৬ ফেব্রুয়ারি ভূমিকম্পের দিনই জাতিসংঘে নিযুক্ত সিরিয়ার রাষ্ট্রদূত বাসসাম আল সাব্বাগ সাংবাদিকদের বলেন, দামেস্ক যে কোনো আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহযোগিতাকে স্বাগত জানাবে, তবে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে সেটি কর্তৃপক্ষের হাত দিয়েই যেতে হবে। তার কথা থেকে এটি স্পষ্ট যে, সরকারকে এড়িয়ে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সরাসরি ত্রাণ পাঠান যাবে না। আশঙ্কা রয়েছে, আসাদ সরকারের মাধ্যমে করা হলে দুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছাবে না, পৌঁছালেও তা হবে প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। কারণ গৃহযুদ্ধ, করোনা মহামারি, লেবানন ও ইরানের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থনৈতিক সংকট এবং ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য প্রচণ্ড অর্থ সংকটে রয়েছে আসাদ সরকার। সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে অনাস্থার মাশুল গুণতে হচ্ছে ভূমিকম্প উপদ্রুতদের। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাই বিশেষভাবে এদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
