৬০ সেকেন্ডের ‘সন্ত্রাস’!

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৬:৩০

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলছে ২০১১ সাল থেকে। আর তুরস্কে কুর্দিদের সঙ্গে সরকারের লড়াই চলছে ১৯৭৮ সাল থেকে। এসব যুদ্ধ আর লড়াইয়ে বছরে অনেক মানুষ মারা গেছেন। তবে প্রকৃতির ৬০ সেকেন্ডের তাণ্ডবে কত মানুষের প্রাণ গেছে সেটি এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি যখন তুরস্ক ও সিরিয়ার মানুষ ঘুমিয়ে ছিলেন তখনই পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠে এবং ওপরের ছাদ মাথায় ভেঙে পড়ে। কেউ হয়তো ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছেন বা কেউ চিরঘুমে চলে গেছেন। জাতিসংঘ এই ভূমিকম্পকে ৬০ সেকেন্ডের সন্ত্রাস বলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ বলেছেন, ভূমিকম্প স্থায়ী হয়েছিল ৬০ সেকেন্ড থেকে ৭৫ সেকেন্ড। এতেই দুই দেশে প্রাণ গেছে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের। জাতিসংঘ আশঙ্কা করছে, মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়াতে পারে। ধ্বংস হয়েছে কয়েক হাজার ভবন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আড়াই কোটি মানুষ। এই ভূমিকম্পের ফল দুই দেশকে ভোগ করতে হবে দীর্ঘকাল ধরে।

কতোটা ভয়ংকর ভূমিকম্প : তুরস্কে একই দিনে তিনটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। পূর্ব আনাতোলিয়ান ফল্টে ঘটা প্রথমটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৮। এর বিস্তৃতি ছিল ৩০০ কিলোমিটার জুড়ে। দ্বিতীয়টির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫ এবং বিস্তৃতি ছিল ৮০ কিলোমিটার জুড়ে। এছাড়া তুরস্কে ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পসহ কয়েক শ আফটারশক হয়েছে দুই দেশে।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির ভূতাত্ত্বিক জানুকা আত্তানায়েকে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, ৬ ফেব্রুয়ারি সকালে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে যে শক্তি নির্গত হয় তা প্রায় ৩২ পেটাজুলের সমান ছিল। (জুল হচ্ছে শক্তির একক) এই পরিমাণ শক্তি একটানা এক ঘণ্টা ৮ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন মেগাওয়াট উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট। এটি প্রায় ৮ মিলিয়ন টন টিএনটি (বিস্ফোরকের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়) দ্বারা নির্গত শক্তির সমতুল্য। নিউ ইয়র্ক টাইমস উল্লেখ করেছে যে আরেক জন ভূমিকম্প বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রেনাটো সলিডাম ২০১৩ সালে আউটলেটকে বলেছিলেন যে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হিরোশিমায় আঘাত করা পারমাণবিক বোমার ৩২টির সমান শক্তি তৈরি করে। যদিও বিস্ফোরক দিয়ে মানুষের তৈরি পরমাণু বোমায় ক্ষতির পরিমাণ সাধারণত বেশি হয়।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভূমিকম্প থেকে সৃষ্ট শক্তি দিয়ে নিউ ইয়র্ক শহরে (আয়তন ৭৮৩ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ৮৮ লাখের বেশি) চার দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ কাজ করা যায়। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ জানিয়েছে, পূর্ব আনাতোলিয়ান ফল্টে এ পর্যন্ত তিনটি ভূমিকম্প হয়েছে। ১৯৭৯ সালে এবং সবচেয়ে ভয়ংকর ভূমিকম্পটি হয়েছিল ১৮২২ সালে যখন দুই লাখ মানুষের প্রাণ যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পে তুরস্কের সীমানা ১০ থেকে ২০ ফুট সরে গেছে। ১৯০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এতে যে শক্তি উৎপন্ন হয়েছিল তা একটা পরমাণু বোমার ৩০ গুণ বেশি। ২০০৪ সালে এশিয়াতে ভূমিকম্পের কারণে সুনামি হয়েছিল। এ সময়ের উৎপন্ন শক্তি ১ হাজারটি পরমাণু বোমার শক্তির সমান।

যুদ্ধের কারণে মৃত্যু কামনা নয়। তবে তুলনামূলক বিচারে দেখা যায়, সিরিয়ায় ২০১১ সাল থেকে চলা গৃহযুদ্ধে ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ মানুষ মারা গেছে। ৬ লাখ হিসেবে ধরলে দিনে মারা গেছে ১৩৭ জন। অথচ এক মিনিটে ভূমিকম্পের সন্ত্রাসে মারা গেছে ৪ হাজারের বেশি মানুষ (রবিবার পর্যন্ত)। আর তুরস্কে ১৯৭৮ সাল থেকে তুর্কি-কুর্দি সংঘাতে ৪০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সেই হিসেবে দিনে মারা গেছে দুই জন। আর ৬০ সেকেন্ডে দেশটিতে জীবন গেল ২১ হাজার মানুষের।

ভূমিকম্পের জেরে তুরস্কের একটি শহর প্রায় দুভাগ হয়ে গেছে। শহরের বুকে বিশাল বড় ফাটল ধরেছে। রাস্তা, মাঠ, পাহাড় এবং জঙ্গল বরাবর সেই ফাটল ধরা পড়েছে ড্রোন ক্যামেরার। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল গাজিয়ানটেপের পার্শ্ববর্তী প্রদেশ কাহরামানমারাসের ছোট শহর তেভেকেলিতে ভূমিকম্পের জেরে বিশাল ফাটল ধরেছে। দেখে মনে হবে, মাঝখান থেকে কেউ যেন চাপ দিয়ে শহরটিকে আড়াআড়িভাবে ভাগ করেছে। তেকেভেলির পাশেই ছোট্ট গ্রাম তেপেহানেও বিশাল ফাটল ধরেছে। কম্পনের জেরে তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তেও বিশাল ফাটল ধরেছে। ইউরোপিয়ান আর্থ-অবজার্ভিং স্যাটেলাইট সেন্টিনেল-১-এ এই ফাটলের দৃশ্য ধরা পড়েছে।

কেন এত ধ্বংসযজ্ঞ : ব্রিটিশ ভূতাত্ত্বিক জরিপের ভূতাত্ত্বিক মার্গারিটা সেগোউ বলেছেন, ভূমিকম্পটি শক্তিশালী ছিল। তার মতে, সাধারণ শক্তিশালী ভূমিকম্প পানির নিচে আঘাত হানে। কিন্তু এবার সরাসরি স্থলে আঘাত হানায় এত বড় বিপর্যয় হয়েছে। তার ওপরে ভূমিকম্পটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আঘাত হানে। তুরস্কের একটি প্রধান শহর এবং প্রাদেশিক রাজধানী গাজিয়ানটেপের কাছে ভূমিকম্পের উৎপত্তি স্থল ছিল। ইউএসজিএস স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার কিশোর জয়সওয়াল বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের আবাসস্থল ছিল। যদিও ইস্তাম্বুলের মতো শহরগুলোতে নতুন ভবনগুলো আধুনিক ভূমিকম্পের মাত্রাকে মাথায় রেখে নকশা করা হয়েছিল। দক্ষিণ তুরস্কের এই অঞ্চলে অনেকগুলো পুরোনো উচ্চ ভবন রয়েছে বলে জয়সওয়াল জানান। গবেষকরা বলছেন, সিরিয়ায় দ্রুত বাড়ি নির্মাণ এবং যুদ্ধই বড় বিপর্যয়ের কারণ। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের জেরে হাজার হাজার ভবন ধসে পড়েছে। জয়সওয়াল বলেছিলেন, এর মধ্যে ‘প্যানকেক’ ধস অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেখানে একটি ভবনের ওপরের তলা সোজা নিচের তলার ওপর পড়ে। এটি একটি নিদর্শন যে, ভবনগুলো কম্পন সহ্য করতে পারে না। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা এবং ভূমিকম্পকবলিত এলাকা ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করা বাসিন্দাদের যানজটের কারণে উদ্ধার তত্পরতা ব্যাহত হয়েছে। এতেও ধ্বংসের পরিমাণ বেড়েছে। -নিউ ইয়র্ক টাইমস, বিজনেস ইনসাইডার ও ইউএন নিউজ

ইত্তেফাক/ইআ