চয়ন

মাটিতে মানুষ নাই

আপডেট : ১৯ জুন ২০১৯, ২০:০৬

সুফিয়া কামাল

 

আমরা ছোটবেলায় ছোট ছিলাম। কিন্তু এখন ছোটরা তাদের ছোটবেলায় আর ছোট নেই। অনেক জ্ঞানী-গুণী হয়ে গেছে। কাজেই আমাদের কালের সঙ্গে এ-কালের কোনো মিল নেই। আমাদের সময়ে সারা রমজানের পর ঈদের চাঁদ উঠবে—আমরা আনন্দে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে গেছি—ঈদ আসছে, ঈদ আসছে। রোজার চাঁদ দেখেই মুরুব্বীদের সালাম করতে হতো। পহেলা রমজানে কোনো শিশু রোজা রাখলে তা পালন করা হতো উত্সবের দিন হিসাবে। যারা প্রথম রোজাদার হতো, তাদের মেহেদি পরানো হতো, নতুন জামা পরানো হতো। এ উপলক্ষে এতিম বাচ্চাদের মেহেদি পরিয়ে, নতুন জামা গায়ে দিয়ে একসঙ্গে ইফতারির ব্যবস্থা করা হতো। আমার বয়েস তখন ছ বছরও পুরো হয়নি। ভাইবোনদের সঙ্গে রোজা রেখে আমি প্রথম রোজাদার হলাম। আমাকেও মেহেদি পরানো হলো, নতুন জামা পরানো হলো। এতিম বাচ্চারাও বাদ গেল না। সারা দিন ঠিক থেকে সন্ধ্যেবেলা বললাম, ‘পানি খাব’। তারপর ইফতারির সময় পানি মুখে দিয়েই ফিট হয়ে গেলাম। রাত তিনটায় ঘুম ভাঙল। চোখ মেলেই বললাম, পানি খাব।

তো ঈদ এলেই গরিব-বড়লোক সব পরিবারেই একটা আনন্দের সাড়া পড়ে যেত। আমরা কোন সকালে উঠে গোসল-টোসল করে ফিটফাট হয়ে থাকতাম। বাড়ির বেটাছেলে, বাচ্চারা মসজিদে গেছে নামাজ পড়তে। গরিব-দুখীদের সঙ্গে একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েছে। ঈদের ফেতরা নিয়ে গরিবরা তাদের হাতের মুঠিটা ভরতে পেরেছে। ধনী-দুখীরা ঈদের দিনে কোলাকুলি গলাগলি করে একে অন্যকে আনন্দের ভাগ দিয়ে মেলামেশা করেছে। এখন যেন সেইটায় ভাঁটা পড়ে গেছে। আবার যেন সেইদিন, সেই ঈদ ফিরে আসে—ঈদের ময়দানে নামাজের শেষে কোলাকুলি শেষে গরিব-দুখীকে আদর করে ঘরে ডেকে এনে ঈদের দিনের আনন্দটা, উত্সবটা, তার মাধুর্যটা পরিপূর্ণ করে তুলতে পারে। ঈদ হচ্ছে সবার মিলন। সব মানুষ সমান—এই কথাটা মনে রেখে আল্লাহর কাছে মানুষ যেন তার প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা দিয়ে বিশ্ব মানবতাকে মহত্ত্ব্ব দানে উজ্জীবিত হতে পারে।

আজকালকার দিনে বড় বড় লোকেদের বাড়ির আঙিনায় কেউ ঢুকতে পারে না। এ-কাল আর সে-কালের ঈদের মধ্যে অনেক তফাত হয়ে গেছে। সেই আগেকার ঈদ, এই এখনকার ঈদের সঙ্গে তার কোনো তুলনা নাই। হয়ই না। সেই আন্তরিকতা আর আশাও করা যায় না। এইজন্যে যে, বড় বড় লোকেরা এখন বড় বড় ফ্ল্যাট-বাড়িতে থাকে। ওরা তো কারো সঙ্গে মেলামেশা করতে পারে না। ওদের আঙিনায় সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। ওদের দশতলা-চৌদ্দতলা বাড়ির ওপর কোন গরিবের ছেলে গিয়ে উঠবে? এখন মাটিতে মানুষ নাই। এখন মানুষ থাকে শূন্যের ওপরে। কাজেই মানুষের মনও শূন্য হয়ে যাচ্ছে। এইটা ভেবে আমার বড় দুঃখ লাগে। আমাদের কালে ঈদে এর বাড়িতে ও যেত। ওর বাড়িতে এ যেত। যার যেটুকুন সাধ্য, তা নিয়ে সবাই সবার আনন্দের ভাগী হতো। এখন ঈদের আনন্দ নিজস্ব গণ্ডির মধ্যেই আবদ্ধ।        (অংশ)

সূত্র: ছোটদের কাগজ (১৯৯৯)