হংকংয়ে গণতন্ত্রের আন্দোলন

আপডেট : ১৯ জুন ২০১৯, ২১:৫৮

এ মাসের প্রথম দিকে হংকংয়ে শুরু হওয়া গণ-আন্দোলন এখন প্রবল আকার ধারণ করেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ নেমে এসেছে হংকংয়ের রাজপথে। এ আন্দোলনের শুরুটা ছিল ‘বহিঃসমর্পণ বিল’ নিয়ে। বিলটি পাস হলে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হংকংয়ের নাগরিকদের চীনের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ সৃষ্টি হতো। আন্দোলনের মুখে বিলটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয় চীন কর্তৃক নিযুক্ত হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম। চীনা প্রশাসক সার্বিক পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও বিক্ষোভকারীরা তা মানেনি। বরং আন্দোলনকারীরা রাজপথ না ছেড়ে লামের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই নমনীয়তায় অনমনীয় হয়ে উঠেছে বিক্ষোভকারী লাখো জনতা। তারা স্থায়ীভাবে বিলটি বাতিলের দাবি জানাচ্ছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাজারো দাবি। আন্দোলনকারীরা বলছে, তাদের মিছিলে ৭০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছে। তবে হংকংয়ের পুলিশ বলছে আন্দোলনকারীদের সংখ্যা ৩-৪ লাখ হবে। লাম পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানানোর ফলে আন্দোলনের তীব্রতা সামনের দিকে আরো বৃদ্ধি পাবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করে। এ নিয়ে বেইজিং কর্তৃপক্ষ একরকম নির্লিপ্ততা প্রদর্শন করছে।  মূলত এই আন্দোলন হচ্ছে চীনের ‘এক দেশ দুই নীতি’ ব্যবস্থার তীব্র প্রতিবাদ। চীনের অনুসৃত সাম্যবাদী রাজনৈতিক দ্বৈত ব্যবস্থার বিপরীতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে।

হংকংয়ে আন্দোলন-বিক্ষোভ নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরেই চলছে এই আন্দোলন। তবে এগুলোর প্রকৃতি ইতিপূর্বে ছিল শান্তিপুর্ণ। কখনো কখনো অসহযোগের মাধ্যমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। এবারই প্রথম হংকংয়ের বিক্ষোভ সহিংস হয়ে উঠেছে। লাখ লাখ লোকের অংশগ্রহণে বিক্ষোভ প্রদর্শনের বিষয়টি হংকংয়ের ইতিহাসে এবারই প্রথম। এদের বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। গুলিবর্ষণের আদেশ দেওয়া হয়নি। সত্যি কথা বলতে কি, এ আন্দোলনে গতানুগতিক বা সংগঠিত কোনো নেতৃত্বের প্রকাশ ঘটেনি। সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিচ্ছে নেতৃত্বশূন্য তরুণরা। বিকাশ ঘটছে ‘কালেকটিভ লিডারশিপ’ বা যৌথ নেতৃত্বের। আন্দোলনের শুরুতে এই সম্মিলিত নেতৃত্ব অভাবনীয় ঘটনার জন্ম দেয় হংকং পার্লামেন্টের সামনে। চীনের মূল ভূখণ্ডে বন্দি প্রত্যর্পণের প্রস্তাবিত বিলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে গিয়ে ওই দিন তারা দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই তরুণ নেতৃত্ব মনে করে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দিয়ে কোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়।

হংকং কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র নয়। হংকং এখন গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের একটি বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল। পীতসাগর জুড়ে এর অবস্থান। দক্ষিণ চীনের পার্ল নদীর অববাহিকায় ৪২৬ কিলোমিটার আয়তনের এই জনপদ। জনসংখ্যা ৭.৪ মিলিয়ন। এটি পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য জন-অধ্যুষিত অঞ্চল। হংকং বিগত ১০০ বছর ধরে ব্রিটিশ কলোনি ছিল। ১৮৪২ সালে প্রথম আফিম যুদ্ধের সময়ে এটি ব্রিটিশ কলোনিতে পরিণত হয়। ১৮৬০ সালে দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে হংকংয়ের পরিসর বিস্তৃত হয় কওলুন উপত্যাকা পর্যন্ত। আফিম যুদ্ধ হলো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের এবং চীনের কিং রাজবংশের সংঘটিত যুদ্ধ।

১৮৯৮ সালে চীনের কাছ থেকে ব্রিটেন ৯৯ বছরের জন্য হংকংয়ের লিজ নেয়। লিজের সময় পূর্ণ হলে এই সেদিন ১৯৯৭ সালে সেখানে চীনের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘকাল ধরে সেখানে পৃথক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে হংকং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে অগ্রসর হয়। এই স্বাতন্ত্র্যের কারণে মূল চীনের সঙ্গে হংকংয়ের বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীনের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও জনগণের একটি অংশ চীনের কর্তৃত্ব মেনে নিতে অস্বীকার করে। চীনের সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং হংকংয়ের পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার পার্থক্য দূরত্ব তৈরি করে। চীন হংকংয়ের স্বাতন্ত্র্য অনেকটা মেনে নেয়। তারা নিজেদেরকে হংকংবাসী বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আয়তনে ছোট হলেও এটি পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক শক্তি। এটি একটি নিরাপদ আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। সমুদ্রবন্দর হিসেবে এর ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। এর অর্থনীতি এতটাই শক্তিশালী যে এর নিজস্ব মুদ্রা রয়েছে। হংকং ডলার পৃথিবীর ১৩তম শক্তিশালী মুদ্রা। এটি পৃথিবীর নবম আমদানিকারক এবং দশম রপ্তানিকারক দেশ। পৃথিবীর প্রসিদ্ধ অনেক বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সদর দপ্তর এখানে অবস্থিত। এর মাথাপিছু আয় শীর্ষস্থানীয়। মানব উন্নয়ন সূচকেও এর অবস্থান উচ্চে। যদিও হংকং এর মাথাপিছু আয় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়, তথাপি জনগণের মধ্যে আয় বৈষম্য রয়েছে  চোখে পড়ার মতো।  হংকং এ রয়েছে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক উঁচু ভবন। এর বেশির ভাগই হংকং এর ভিক্টোরিয়া হারবার এলাকা ঘিরে। কোনো একটি অজানা কারণে হংকং এর মানুষ দীর্ঘায়ূ হয়ে থাকে। দেশটির ৯০ শতাংশ মানুষ গণপরিবহন ব্যবহারে অভ্যস্ত। এ অঞ্চলে মানুষ বসবাস করতে শুরু করে ৬ হাজার বছর পূর্বে।  প্রথম দিকে যারা হংকং-এ বসবাস করতে শুরু করে তারা ছিল অনেকটাই উপকূলীয় মানুষ। আনুমানিক ২০০ খ্রিস্টপূর্বে কিন রাজবংশ প্রথমবারের মতো হংকংকে চীনের সঙ্গে একীভূত করেছিলেন। 

এসব কারণে চীনের কাছে তো বটেই, পৃথিবীর তাবত্ শক্তিশালী রাষ্ট্রের কাছে হংকংয়ের গুরুত্ব সমধিক। পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমেও হংকংয়ের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। প্রখ্যাত ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, হংকংয়ের চীনা কর্তৃপক্ষ বিষয়টির সংবেদনশীলতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। গার্ডিয়ান আরো মন্তব্য করে যে, এ ব্যাপক বিক্ষোভের পেছনের না-বলা কথাটিকেও কর্তৃপক্ষের বুঝতে হবে। পত্রিকাটি বিলটি পরিত্যাগ না করে স্থগিতকরণের সমালোচনা করেন। পত্রিকাটি আরো আলোকপাত করে যে এটা তাত্পর্যপূর্ণ যে বিক্ষোভকারী জনগণ মূল চীনকে তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেনি।

১৯৫০ দশকে হংকং প্রথম এশিয়ার অর্থনীতিতে মাথাচারা দিয়ে ওঠে। বিশেষ করে শিল্পে। একদিকে দ্রুত বাড়তে থাকে জনসংখ্যা, অন্যদিকে বাড়তে থাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। উপনিবেশিক শাসকরা তখন নানা ধরনের আইনি সংস্কার  ও সামাজিক সংস্কারে হাত দেয়। ১৯৯০ দশকে হংকং নিজেকে একটি পরিপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং শিপিং হাব হিসাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।

হংকংয়ের গণবিক্ষোভের আরেকটি বড় সর্বনাশের কারণ হতে পারে এর অর্থনৈতিক বিপর্যয়। পৃথিবীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি হিসেবে হংকংয়ের ধস নামলে গোটা পৃথিবীর জন্য তা বড় রকমের ক্ষতির কারণ হতে পারে। খোদ চীনের জন্য এটি হুমকি স্বরূপ। তার কারণ অর্থনীতি পরস্পর নির্ভরশীল একটি বিষয়। দক্ষিণ চীনের ব্যবসায়-বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রভূমি হংকং। বৈশ্বিক বাণিজ্যে লিপ্ত চীন এই পরিস্থিতিতে পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে মার্কিন কংগ্রেস হংকংয়ের মর্যাদা ক্ষুণ্নকর প্রত্যর্পণ বিলের সমালোচনা করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সংকট সম্পর্কে ঐ অঞ্চলের অর্থনীতিবিদরাও উদ্বিগ্ন।

n লেখক: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়