পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পায়রা তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্রে শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হামলা পাল্টা হামলায় এক চীনা শ্রমিক নিহত হয়েছেন। নিহতের নাম জাং ইয়াং ফাং (২৬)। তিনি ইলেকট্রিশিয়ান হিসাবে কর্মরত ছিলেন। দুর্ঘটনাজনিত কারণে এক বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুর পর লাশ গুম করার গুজবে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত।
জানা গেছে, মঙ্গলবার দিনভর বাংলাদেশি ও চীনা শ্রমিকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। রাত ১১টার দিকে পটুয়াখালী থেকে অতিরিক্ত পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এসময় পাঁচ চীনা নাগরিক ও তিন বাংলাদেশি শ্রমিক আহত হন। আহতদের রাতেই বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (শেবাচিম) ভর্তি করা হয়। গতকাল বুধবার ভোরে চিকিত্সাধীন অবস্থায় জাং ইয়াং ফাং মারা যান। হাসপাতালের চিকিত্সক মাহবুবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় গতকাল সকাল থেকে নির্মাণাধীন বিদ্যুত্ কেন্দ্রটির সব ধরনের কাজ বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুত্ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সকালে বিদ্যুত্ কেন্দ্র এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। হামলার আশঙ্কায় রাতেই অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মস্থল ছেড়ে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে।
সংঘর্ষে আহতরা হলেন: চীনা শ্রমিক জুগান (৫৪), লিন ইউং লিন (৪০), মুজাং হাং (৩৫), জাহাং সেনং (৬০) এবং বাংলাদেশি শ্রমিক মো. আলতাফ হোসেন (৪৪), মো. মোস্তাফিজুর রহমান (৪৮) ও মাহবুব আলম (২৫)। চীনা শ্রমিকদের উন্নত চিকিত্সার জন্য গতকাল ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। অন্য আহতরা শেবাচিম হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত মঙ্গলবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে বিদ্যুেকন্দ্রের নির্মাণাধীন বয়লার থেকে বেল্ট ছিঁড়ে নিচে পড়ে বাংলাদেশি শ্রমিক সাবিন্দ্র দাসের (৩২) মৃত্যু হয়। ঘটনার পর পর তার লাশ গুম করা হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েক হাজার বাংলাদেশি বিক্ষুব্ধ শ্রমিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালায়। এসময় চীনা শ্রমিকদের সঙ্গে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষের হামলা-পাল্টা হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে।
বিদ্যুেকন্দ্রের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহমনি জিকো জানান, ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা গুজবের কারণে উত্তেজিত হয়ে ক্যান্টিনে, অফিসে ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুর চালায়। বর্তমানে কেন্দ্রে বিজিবি, পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রয়েছে। এদিকে সংঘর্ষের ছবি তুলতে গিয়ে প্রতিদিনের সংবাদের কলাপাড়া প্রতিনিধি ফরাজী মো. ইমরানের মোটরসাইকেল ও মাইটিভির কলাপাড়া-কুয়াকাটা প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম রয়েলের ক্যামেরা ভাঙচুর করেন চীনা শ্রমিকরা। এসময় তাদের ধাওয়ায় আরও দুই সাংবাদিক মিজানুর রহমান বুলেট ও মিলন সরকার ঘটনাস্থল ত্যাগ করে পুলিশের কাছে আশ্রয় নেন।
জানা গেছে, নিহত শ্রমিক জাং ইয়াং ফাং চীনের ল্যাং লেওয়ানিং এর খান সেং সু এলাকার চাং এবং চো রং ফেন দম্পতির ছেলে। নিহত অপর শ্রমিক সাবিন্দ্র দাস হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার জয়নগর গ্রামের নগেন্দ্র দাসের ছেলে। শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. বাকির হোসেন জানান, বুধবার ৩টা ৫০ মিনিটে আইসিইউতে চিকিত্সাধীন অবস্থায় জাং ইয়াং মারা গেছেন। তার মাথায় আঘাত ছিলো এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিলো। আহত অন্যান্য চীনা শ্রমিককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে তাদের সেখান থেকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গতকাল সকালে শেবাচিম হাসপাতালে আহতদের দেখতে আসেন বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার রাম চন্দ্র দাস ও রেঞ্জ ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম। বিভাগীয় কমিশনার বলেন,‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততার সঙ্গে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ-চীন বন্ধু রাষ্ট্র। তাই বিষয়টি আরো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।’
কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, শ্রমিক সাবিন্দ্র দাসের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পটুয়াখালী মর্গে পাঠানো হয়েছে। চীনা শ্রমিকের লাশ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে কলাপাড়া থানায় একটি মামলা করেছে। তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এদিকে চীনা শ্রমিক জাং ইয়াং ফাং নিহত হওয়ার ঘটনায় ভবিষ্যতে কোনো মামলা করা হবে না দাবি করে বিনা ময়নাতদন্তে তার লাশ গ্রহণের জন্য বরিশালের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করেছেন তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্রের প্রজেক্ট ম্যানেজার লিউ সি।
প্রসঙ্গত, নির্মাণাধীন পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্রটিতে বর্তমানে ছয় হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে দুই হাজারেরও বেশি চীনা শ্রমিক ও প্রকৌশলী রয়েছেন।
