এখলাসপুর গ্রামের ছেলে-বুড়ো সবার হাতে মোবাইল। দিনমান পিড়িং পিড়িং! মেসেজ আসে। কোত্থেকে? দুনিয়ার নানা জায়গা থেকে। তবে একজনের মোবাইলে মেসেজ আসে না। তিনি নেট অন করে বসে থাকেন। মেসেজের আশায়। অই যে, পুকুরের পানিতে বড়শি ফেলে ইলিশ মাছের অপেক্ষার মতো! মোবাইল রিস্টার্ট দেন। তাতেও কাজ হয় না। সেটিংস অপশনে গিয়ে কারিকুরি করেন। তাতেও না। হতাশ হয়ে শুয়ে পড়েন। রাস্তায়। ঘাসের ওপর। শুয়ে মোবাইলে অঙ্ক কষেন। এটা তাঁর পুরনো অভ্যেস। ২৫ থেকে ৫ বিয়োগ করেন। তারপর ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেন—
বলছি আমি উইকি
২৫ থেকে ৫ বিয়োগ
কয়বার যায়—
বলতে পারিস তুই কি?
ও তোমাদের তো বলাই হয়নি। এই একজন যিনি মোবাইল হাতে মেসেজের অপেক্ষায় থাকেন। যিনি হতাশ হয়ে অঙ্ক করেন তিনি এখলাসপুরের বাচ্চাকাচ্চাদের কাছে উইকি মিয়া নামে পরিচিত। ফেসবুক বন্ধুরাও তাঁকে উইকি মিয়া নামেই চেনেন। অনেক অনেক আগে উইকিপিডিয়ায় নাকি তাঁর নামে একটা আইডি ছিল। কত আগে? তা বলা যাবে না। কী জন্য খোলা হয়েছে তা-ও না। এখন চলো, উইকি মিয়ার ফেসবুক স্ট্যাটাসে ঢুকি। ২৫ থেকে ৫ কয়বার বিয়োগ করা যায়—এই নিয়ে ফেসবুক বুদ্ধিজীবীরা তোলপাড় শুরু করেছেন। নিতিনের বাবা বলেন, ‘ও নিতিন, ২৫ থেকে ৫ কয়বার বিয়োগ যায় বলতে পারিস?’ নিতিন বলে, ‘চক্কেট দেবা?’ চকলেট হাতে পেলে নিতিন যে কোনো ধাঁধার উত্তর বলে দিতে পারে। এটা আশ্চর্য হলেও সত্যি!
নিতিনের বাবা বলেন, ‘এত বড় হয়েছিস। এখনো চকলেট বলতে পারিস না। দেবো না।’
তখনই ডোরবেল বাজে। নিতিনের বাবার মেজাজ বিগড়ে যায়। বলেন, নিশ্চয়ই নিতিনের পাজি বন্ধুটা এসেছে। সেই দুপুর থেকে একটু পর পর এসে ট্যা ট্যা বেল বাজিয়েই যাচ্ছে। নিতিন দরজা খুলতেই বুবুন তাকে একটা হেঁচকা টান দিয়ে বের করে নেয়। নিতিন স্বাভাবিক হওয়ার আগেই বলে, ‘অ্যাই, দরজা খুললি ক্যান? আমি তো তোদের ডোরবেলের আওয়াজ শোনার জন্যই একটু পরপর এসে ডোরবেল বাজাই। গ্রামে তো আর কারো ঘরে ডোরবেল নেই।’ নিতিনের বুকটা গর্বে ফুলে ওঠে। গ্রামে একমাত্র তাদের ঘরেই ডোরবেল আছে। তাই সে বুবুনকে বলে, ‘তুই তো এটা সবাইকে বলতে পারিস। সবাই এসে আমাদের ডোরবেল বাজাত। এতে তাদের ভালো লাগত।’ বুবুন বলে, ‘ঠিক আছে বলব। আচ্ছা, পিয়াজুর ইতিহাস বলতে পারবি?’
‘না।’
‘চল, উইকি মিয়ার কাছে যাই।’
‘কেন?’
বুবুন বলে, ‘আর বলিস না। আমার এক কাকু এসেছেন শহর থেকে। শুধু ইতিহাস বলেন। দুপুরে টাইম জিজ্ঞেস করলাম অমনি ঘড়ি আবিষ্কারের ইতিহাস শুনিয়ে দিলেন। সন্ধ্যায় ইফতার করতে বসলে নিশ্চয়ই ছোলা, পিয়াজু, বেগুনি নিয়েও শোনাবেন রাজ্যের ইতিহাস। তাই ভাবলাম, উইকি মিয়ার কাছে যাই। পিয়াজু, বেগুনির ইতিহাস শুনে আসি।’
অমনি দুজন গেল উইকি মিয়ার কাছে। উইকি মিয়া মোবাইলে ডাটা অন করে বসে আছেন। বুবুনদের দেখেই বললেন, ‘কী রে, কী জানতে এসেছিস?’
বুবুন বলে, ‘পিয়াজু। পিয়াজুর ইতিহাস জানতে এসেছি।’
উইকি মিয়া উইকি করে বলেন, ‘সর্বনাশ, এখনো কেউ উইকিতে পিয়াজু নিয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। দাঁড়া, আমিই দিচ্ছি তথ্য।’
বুবুন বলে, ‘শুধু পিয়াজু দিলে চলবে না। ছোলা, বেগুনি, আলুর চপ, পাকোড়ার তথ্যও দিতে হবে।’
উইকি মিয়া মনোযোগ দিয়ে উইকি করছেন। তখনি পিড়িং! এই প্রথম তার মোবাইলে মেসেজ এল। কোত্থেকে? নিতিনের বাবার নম্বর থেকে। কী মেসেজ? নিতিনের বাবা লিখেছেন—সি ইউর ফেসবুক স্ট্যাটাস।
উইকি মিয়া ফেসবুকে গেলেন। দেখেন, কমেন্ট করেছে নিতিনের বাবা—
এই ধাঁধাটা এমন
খালি পেটে রসগোল্লা যেমন!
উইকি মিয়া অবাক হয়ে ভাবেন, কেমন করে বুঝল সে। তিনি তাড়াহুড়ো করে ফোন দেন নিতিনের বাবাকে। বলেন, ‘ব্যাখ্যা করো তো দিলু মিয়া?’ ও নিতিনের বাবার নাম তো বলা হয়নি। দেলওয়ার হোসেন দিলু। বড়রা ডাকেন দিলু বলে। আর উইকি মিয়া ডাকেন দিলু মিয়া। তো দিলু মিয়া বলেন, ‘অই যে, বলে না, আপনি খালি পেটে কয়টা রসগোল্লা খেতে পারবেন?
উত্তর হলো একটাই। কারণ, একটা রসগোল্লা খেলেই তো আর পেট খালি থাকে না! ঠিক সেই যুক্তিতেই ২৫ থেকে ৫ একবারই বিয়োগ করা যায়। একবার ৫ বিয়োগ করা হলে সংখ্যটা তো আর ২৫ থাকে না।’
ও বাবা; অবাক হয়ে যান উইকি মিয়া। কানে মোবাইল ধরেই অবাক চোখে তাকান নিতিনের দিকে। নিতিন চকলেট খায় আর মুচকি হাসে!
