পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০১৫ সালের পরমাণু প্রকল্পবিষয়ক ঐকমত্য হইতে ইরানের সরিয়া যাইবার দিন ঘনাইয়া আসিতেছে। তেমন কোনো বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন না ঘটিলে এই মাসের ২৭ তারিখ নাগাদ এই সিদ্ধান্তটির বাস্তবায়ন ঘটাইবে ইরান। ছয়-জাতির সহিত ইরানের ঐকমত্যটি ভাঙিয়া গেলে উপসাগরীয় অঞ্চল তথা বিশ্বপরিস্থিতি যে নূতন করিয়া অশান্ত হইয়া উঠিবে—তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। ইরানের সহিত পরমাণু প্রকল্প বিষয়ে ঐকমত্য স্থাপনকারী দেশগুলি হইতেছে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন। জার্মানি ব্যতীত বাকি পাঁচ দেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। এই দেশগুলির মধ্যে আমেরিকা ব্যতীত অন্য দেশগুলি মনে করে যে ইরান পরমাণু প্রকল্পবিষয়ক ঐকমত্যের শর্তগুলি ভালোভাবেই মান্য করিতেছে। পক্ষান্তরে, ইরান কর্তৃক শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ আনিয়া ঐকমত্য হইতে বাহির হইয়া গিয়াছে আমেরিকা। বস্তুত প্রধান শক্তিধর দেশটির এহেন অবস্থান গ্রহণের পর হইতেই পরিস্থিতি ঘোরালো হইয়া উঠিয়াছে। আমেরিকার পাল্টা অবস্থান হিসাবে ইরানও ঐক্যমত্য হইতে বাহির হইয়া যাওয়ার ঘোষণা দেওয়াতে পরিস্থিতি সংঘাতময় হইয়া উঠিবার উপক্রম হইয়াছে। উল্লেখ্য, ইরান ঐকমত্য হইতে বাহির হইয়া যাইবার পরে তাহার পরমাণু প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম পরিশোধনের উপরে প্রদত্ত বিধিনিষেধ আর মান্য করিবে না।
এইদিকে, গত কয়েক দিনের মধ্যে ওমান উপসাগরে জাপান ও নরওয়ের দুইটি তৈলবাহী জাহাজ ও ইরাকের বসরাতে আমেরিকার তৈলখনিতে নামধামহীন হামলার ঘটনায় উত্তেজনা আচমকাই কয়েক গুণ বাড়িয়া গিয়াছে। এই হামলাগুলির জন্য আমেরিকা ও তাহার মিত্ররা ইরানকে দায়ী করিয়াছে। ঐকমত্য বাঁচাইবার জন্য ছয়-জাতি জোটের তিনটি দেশ অর্থাত্ জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন একসঙ্গে কাজ করিতে শুরু করিতেছে। ইতোমধ্যে দুই প্রধান প্রতিপক্ষ অর্থাত্ আমেরিকা ও ইরানের সহিত তাহারা একাধিকবার বৈঠক করিয়াছে বলিয়াও সংবাদমাধ্যম সূত্রে প্রকাশ। তবে এখন অবধি এই দুই দেশ নিজ-অবস্থানে অনড় রহিয়াছে। আমেরিকার মতে, ইরানকে ঐকমত্যের শর্ত মান্য করিবার যথেষ্ট প্রমাণ দিতে হইবে। অন্যদিকে ইরানের মতে, এতদিন ধরিয়া যথাযথভাবে শর্ত মান্য করিবার পরেও অবরোধগুলি কেন তুলিয়া লওয়া হইতেছে না—তাহার জবাব আমেরিকা ব্যতীত বাকি পাঁচ দেশগুলিকে দিতে হইবে। উল্লেখ্য, ঐকমত্য হইতে সরিয়া গেলেও, আমেরিকার কোপে পড়িবার ভয়ে অনেক দেশই এখন অবধি ইরানের সহিত বাণিজ্য বা বিনিয়োগ সম্পর্কে যাইবার সাহস করিতেছে না। ইরানের অভিযোগ ছয় জাতির অন্তর্ভূক্ত ইউরোপের দেশ তিনটিও এই ব্যাপারে তেমন কোনো লক্ষণীয় উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছে না। রাশিয়া ও চীনকেও এইক্ষেত্রে তেমন একটা অগ্রসর হইতে দেখা যাইতেছে না।
ইরান ইতোমধ্যে জানাইয়াছে যে, ঐকমত্য হইতে বাহির হইয়া যাওয়া কোনো দেশ অর্থাত্ আমেরিকার সহিত তাহারা কোনো ধরনের আলোচনাতে বসিবে না এবং চাপের মুখে নতি স্বীকার করিবে না। এইদিকে, আমেরিকা আবার ইরানের প্রতিবেশী ইরাক হইতে ইরানের আক্রমণের আশঙ্কার কথা বলিয়া তাহার লোকজন সরাইয়া ফেলিতেছে। তাহা ছাড়াও সমপ্রতি যুক্তরাষ্ট্র নূতন করিয়া আরো ১ হাজার সৈন্য মধ্যপ্রাচ্যে প্রেরণ করিয়াছে। এমতাবস্থায়, মধ্যস্থতাকারী তিন দেশ যুদ্ধের আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করিতেছে। তেমন কিছু হইলেও বিশ্বপরিস্থিতি কোনো দিকে যাইবে তাহা সহজেই অনুমেয়।
