প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর এক সমাবেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর পুনরায় নির্বাচনে প্রার্থীতার প্রচারণা শুরু করেছেন। যদিও এই প্রচারণা ২০২০ সালে পুনরায় নির্বাচনের জন্য প্রচারণা, কিন্তু তার ৭৬ মিনিটের বক্তব্য এবং স্লোগান ছিল ঠিক আগের মতোই। শুনলে আপনি ভুল করে মনে করতে পারেন যে ২০১৬ সালের কথাই শুনছেন।
ঠিক ২০১৬ সালের মতোই অরল্যান্ডোতে বিশাল এবং চকচকে ব্যানারে লেখা চিল ‘কিপ আমেরিকা গ্রেট’। আগের চেয়ে সামান্য আপডেট করা হয়েছে মাত্র। সমাবেশে ছোট ছোট ব্যানারে লেখা ছিল, MAGA, অর্থাত্ ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। ট্রাম্প নিজে এই সামান্য পরিবর্তনের ব্যাপারে অবগত ছিলেন না বলেই মনে হয়। এমনকি তিনি এক পর্যায়ে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘সর্বকালের সবচেয়ে সফল রাজনৈতিক স্লোগানটি পালটাতে পারে কে?’
ট্রাম্প তাঁর ‘পছন্দের’ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিলারি ক্লিনটন সম্পর্কে অনেক কথা বলেছেন। হিলারি সম্পর্কে নানা কথা বলে তিনি তাঁর সমাবেশের লোকদের উত্তেজিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু এই ২০১৯ সালে তাঁর সমাবেশ থেকে হিলারিকে উদ্দেশ্য করে Crooked Hillary এবং Lock Her Up জাতীয় কথা উচ্চারিত হতে শুনে আমার মনে হয়েছে, হয়তো ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই প্রচারণাযাত্রায় নতুন বিষয় এবং নতুন প্রতিপক্ষ খুঁজে পেতে কষ্ট হচ্ছে। অথবা তিনি হয়তো সেটাই নিয়েই আছেন, যেটুকু তিনি জানেন। যদিও ট্রাম্প দ্বিতীয় দফা নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন এমন একটি সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্রের ইকোনমি একটা ভালো অবস্থায় আছে এবং গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম; তার পরও ট্রাম্প দুর্নীতি, কেলেঙ্কারি এবং অসংখ্য প্রেসিডেন্সিয়াল প্রথা-আচরণ ভাঙার কারণে তিনি আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে অ-জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন। বাস্তবে ৪২.৫ শতাংশ আমেরিকান তাঁর কর্মক্ষমতাকে সমর্থন করেন এবং ৫৩.১ শতাংশ তাকে সমর্থন করেন না।
পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার প্রচারাভিযানের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের সুযোগ ছিল সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার জন্য সম্পূর্ণ নতুন লক্ষ্য উপস্থাপন করা। কিন্তু সত্য হলো, তাঁর অরল্যান্ডোর বক্তৃতাটি দুই বছর বা চার বছর আগে দিতে পারতেন। অথচ তাঁকে মনে হয়েছে হিলারির ইমেইল নিয়ে কথা বলে এবং তাঁর সমাবেশের জনতার Lock Her Up স্লোগান শুনে বেশ খুশি হয়েছেন। আড়াই বছর দায়িত্বে থাকার পর তার বক্তৃতায় যা প্রকাশ পেয়েছে তা হলো তিনি তার সেই পুরোনো ব্যথা এবং সফলতা নিয়েই আছেন।
আমরা ইতিমধ্যেই জেনে গেছি, ট্রাম্পের নতুন প্রচারাভিযানে পুরোনো দুটি ইস্যুই থাকবে : অভিবাসন এবং গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ। ট্রাম্প ইতিমধ্যেই সীমান্ত পরিস্থিতির ব্যাপারে ডেমোক্র্যাটদের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ করে বলেছেন, অবৈধ অভিবাসীদের ঢল আসছে। তিনি সীমান্ত-দেওয়ালের ব্যাপারেও ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন এবং আগামী বছরের শেষ নাগাদ চার হাজার মাইল সীমান্ত-দেওয়াল তৈরি হবে বলে জানান। যদিও আমেরিকার সাংবাদিক এবং মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম কোনো নির্দিষ্ট ব্যালটে নেই, তথাপি ট্রাম্প যেন তাদের বিরুদ্ধে লড়তে চাইছেন। অরল্যান্ডো সমাবেশে স্টেডিয়ামের মাঝখানে থাকা প্রেসের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করেন এবং সমাবেশে উপস্থিতদের সুযোগ করে দেন CNN sucks বলে স্লোগান দিতে।
কে জানে, হয়তো-বা পুরোনো ইস্যুগুলো তুলে ধরাই তার জন্য ভালো কৌশল। হয়তো-বা বর্তমানের চেয়ে তার অতীতের দিকে নজর ফেরানোর চেষ্টার কৌশলটাই বুদ্ধির। অর্থনীতির ভালো অবস্থার পরও আমেরিকা এবং আমেরিকানরা ২০২০ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন নিয়ে একটা সংকটে পড়েছে। ট্রাম্পের তৈরি অভিবাসন সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে তৈরি বন্দিশিবিরগুলো অফিসিয়ালি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। জাতিসংঘ এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে খাশোগিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে হত্যা করা হয়েছে। এবং মুয়েলারের রিপোর্ট প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্র আজ এই প্রশ্নের সম্মুখীন যে দেশের প্রেসিডেন্ট বিচারের ঊর্ধ্বে কি না।
ট্রাম্প তাঁর পুরোনো প্রচারাভিযানের কৌশল পুনরায় চালিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু আমেরিকার আগামী নির্বাচনের প্রেক্ষিতে একটি প্রশ্ন অনেকের মাথায় জেঁকে বসেছে। সেটি হলো—একসময়ের বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী আমেরিকা কি তার সর্বজনবিদিত নৈতিক বলয়ের দিকে ফিরে যাবে? নাকি আরো দূরে সরে যাবে?
ইংরেজি থেকে অনূদিত
n লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক,
নারী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ
