অশ্রুসিক্ত বিদায়ী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের ছবি ইতিমধ্যে মিডিয়ার কল্যাণে আমাদের সর্বসাধারণের নজরে এসেছে। কেউ হয়তবা মের শোকে কাতর, অনেকে হয়তবা পরিবর্তনের আশায় উন্মুখ। আপাতদৃষ্টিতে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নে ব্যর্থ রাজনীতিবিদটির লুকোনো অশ্রু সকলের চোখে পড়েছে, কিন্তু দিনের পর দিন যে মেধাবী পরিশ্রমী রমণীরা নিরবে নিভৃতে নানা কটূক্তি,বর্ণ বৈষম্য নামক এক মনগড়া সামাজিক জাল ছিন্ন করে শুধু মেধা আর ইচ্ছাশক্তির জোরে অবিশ্বাস্য উচ্চতায় নিজেদের নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন, আলোচিত সে শ্যামবর্ণ-কৃষ্ণবর্ণ ব্রিটিশ নারীদের সাফল্যগাথা আজ পাঠকদের সামনে তুলে ধরছি:
১) সেড: নাইজেরিয়ায় জন্ম নেওয়া এ ব্রিটিশ গায়িকা, সঙ্গীত লেখক ও প্রযোজক তার পরিচালিত ‘সেড’ ব্যান্ডের মাধ্যমে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি লাভ করেছেন। রানিমাতা এলিজাবেথের সম্মাননা পাওয়া আর বিয়ন্সে, আলিয়াহ-এর মতো বিখ্যাত শিল্পীদের শিল্পগুরু এই নারীকে এখনো নানা বিদ্বেষের শিকার হতে হয়। ওবিসি ও সিবিই খেতাব জেতা মানুষটির ভাষণে ফুটে উঠেছে সে দৃঢ় প্রত্যয়। তিনি বলেছেন, ‘এটি আমার ও ইংল্যান্ডের সকল কালো নারীর প্রতি এক মহানুভবতা।’
২) শ্যারন হোয়াইট: সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা এ দক্ষ তরুণীটি অতি দ্রুত উচ্চাকাঙ্ক্ষার সিড়ি বেয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ব্রিটিশ মিডিয়ার প্রধান কর্তাব্যক্তি হিসেবে। তিনিই প্রথম কালো রমণী এবং দ্বিতীয় মহিলা যিনি ব্রিটিশ ট্রেজারিতে স্থায়ী সচিব হিসেবে পদ্দোন্নতি পেয়েছেন।
৩) শার্লি থমসন: জ্যামাইকান বংশোদ্ভূত এ রমণীকে সংগীত জগতের এক বিরল ধূমকেতু বলা যেতে পারে। তিনি সর্বপ্রথম ইউরোপে ২০০৪ সালে গত ৪০ বছরের ইতিহাসে তৈরি করেছেন এক অনন্য সংগীত রচনা করে যা বহুদিনের প্রচলিত প্রবাদটি ভেঙে দিয়েছে যে কালো শিল্পীরা কখনো শাস্ত্রীয় সংগীত সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়! এ জাত শিল্পী প্রথম বিবিসি পরিচালিত নাটকের সংগীত পরিচালনা করেন।
৪) শামিন্দার নাহাল: চ্যানেল ফোর এর কমিশনার পদে বর্তমানে কর্মরত নারীটি একদা বিবিসিতে নিউজ এডিটর হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। হেভিওয়েট জার্নালিস্ট হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এ কর্মমুখর তরুণীটি পেশার প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে একের পর এক জন্ম দিয়ে চলেছেন, প্যারিস আক্রমণ থেকে শুরু করে নানা বিস্ফোরণের ও সন্ত্রাসের উপর প্রতিবেদন।
৫) অ্যাঙ্গি লে মার: ব্রিটিশ কৌতুক অভিনেতা অ্যাঙ্গি, আরো কত পরিচয় যে তার! সফল নাট্যকার, নির্দেশক—প্রথম ব্রিটিশ কালো পারফর্মার যিনি হারলেমের অ্যাপেলো থিয়েটারে আমজনতাকে অফুরন্ত হাসির ফোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যান। মূলধারার গণমাধ্যম তাকে আমন্ত্রণ না জানালেও এই অদম্য রমণীটি দমে যান নি, একাকী হেঁটে চলেছেন নিজ তৈরি করা পথে।
৬) জেসিকা হে: দূরদর্শী শিশুটি শৈশবেই বুঝতে পেরেছিল নিজের ভবিষ্যত্। তাই সাদা প্রতিবেশীর কাছ হতে আমন্ত্রণ না পাওয়া কিশোরীটি বিন্দুমাত্র ক্ষুব্ধ হয়নি। বরং সুপ্ত প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করল মাল্টিকালচারাল গ্রিটিং কার্ডস কোম্পানি, যা শুধু ব্রিটেনে নয় বরং আমেরিকা ও সাউথ আফ্রিকাতে ভিন্ন দেশ থেকে আসা অনাবাসীদের জাতীয়তাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
৭) গিনা ইয়াশের: নির্মল হাস্যরস যোগানো আরেক কৌতুক অভিনেতা, যিনি প্রথম ব্রিটিশ প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছেন আমেরিকার জেফ কমিডি শোতে। অ্যাপেলো থিয়েটার, জে লেনো শো এবং দি ডেইলি শোর ব্রিটিশ করেসপনডেন্ট হিসেবে কাজ করা রত্নটিকে মার্কিনিরা চিনতে ভুল করেনি।
৮) টাপোনেসওয়া মেভাঙ্গা: রিসিপশনিস্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা নারীটি আজ ব্রিটিশ কলাম্বিয়া রেকর্ডসের হেড অব পাবলিসিটি-পদটি সসম্মানে অলংকৃত করছেন। একদা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় ব্রিটেনে আবাস গড়া তরুণীটি কটা বছর আগে লন্ডন থেকে সাউথ আফ্রিকা পাড়ি দিয়েছিল এমটিভি আফ্রিকা আর বেট আফ্রিকার হেড অব ট্যালেন্ট ও মিউজিক প্রধান হিসেবে। শেকড়ের সন্ধানে প্রত্যহ মোহমুগ্ধ, অথচ রক্তে নিত্য সুরের খেলা। তাই একের পর এক সৃষ্টি করে চলেছে আটলান্টিক রেকর্ডস ইউকে, ইডি শেরান, শেন পলের মতো সব সময়োপযোগী শিল্পীর মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা।
৯) পলা লাকটাং: যুক্তরাজ্যের খেলা আর গানের জগতের সঙ্গে পরিচিত সকলের মুখে মুখে ফিরছেন এই প্রতিভাময়ীর নাম। সুপরিচিত ব্যান্ড ‘এডিডাসের’ একজন দক্ষ এজেন্ট তিনি, খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মতো যুক্তরাজ্যের আনাচে-কানাচে নানা অনুষ্ঠান আর কর্মশালার মাধ্যমে লুকোনো প্রতিভাগুলো বাছাই করছেন তিনি। এখানেই থেমে থাকেনি অদম্য রমণীটির অগ্রযাত্রা, নিজ কনসালটেন্সি ফার্ম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজের কর্মস্পৃহাকে প্রতিনিয়ত ঝালিয়ে নিচ্ছেন।
১০) আয়েশা হাজারিকা: কী রাজনীতি, কী কৌতুক অভিনয় অথবা মিডিয়ায় বিশ্লেষণী ক্ষমতা— যুক্তরাজ্যের এই চটপটে তরুণীটির প্রাণবন্ত উপস্থিতি সকলের নজর কেড়েছে। অভিবাসীদের রাজনৈতিক দল বলে পরিচিত লেবারের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা নারীটি এখন কমেন্টেটর হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন। তীক্ষ্ন বুদ্ধি, তথ্য আর পরিসংখ্যানের সঠিক উপস্থাপনার মাধ্যমে সপ্তাহান্তে কমপক্ষে ২০০টি রাজনৈতিক টিভি শো পরিচালনা করছেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এ পেশাজীবী তার ধারালো কলাম লেখার দ্বারা প্রত্যহ উদ্বুদ্ধ করে চলেছে সাধারণ জনতাকে। একজন প্রকৃত যোদ্ধা, যার অভিধানে ভুল তথ্যের কোনো স্থান নেই।
১১) অ্যান মারি:গণিত, ভাষা আর কম্পিউটারের এক শিশু বিস্ময়। বাস্তবিক সময়ের বহু আগেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে ফেলেছে এই বিস্ময়কর তরুণী। ২০১৩ সালে স্টিমেটস নামে সামাজিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে পিছিয়ে থাকা অন্য নারীদের কারিগরি শিক্ষায় উজ্জীবিত করছে অ্যান। সে বছরই ইয়াং আইটি প্রফেশনাল আর এমবিই খেতাবে ভূষিত হয়েছে সে। কাজের স্বীকৃতিটি বড় প্রাপ্তি নয়, এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে তার মতো একজন আত্মপ্রত্যয়ী উদ্যোক্তা নিঃসন্দেহে অন্য কালো মেয়েদের অনুপ্রেরণা।
১২) ইউনিস অলুমিড:প্রথম কালো স্কটিশ মডেল, যিনি ব্রিটিশ ফ্যাশন শিল্পে সম্পূর্ণ নতুন ধ্যান-ধারণার জন্ম দিয়েছেন। মালবেরি, বডিশপ, আলেক্সান্ডার ম্যাককুইন প্রমুখ ব্যান্ডের অ্যামবাসাডর হয়েছেন। তিনি একজন অভিজ্ঞ ডিজে শিল্পীও । নিজস্ব গ্যালারি স্থাপন করেছেন, স্বপ্ন বহু দূর যাওয়ার। রানির কাছ থেকে সম্মাননা পাওয়া শিল্পীটির সবচেয়ে বড় পরিচয় তার নিরলস দাতব্য কাজগুলো। স্কটল্যান্ড চাইল্ড হসপাইস, দি ওয়েল ফাউন্ডেশন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ রক্ষা একের পর এক ইতিবাচক উদ্যোগ।
১৩) আনিকা অ্যালেন: দি কালার নেটওয়ার্ক নামে একটি ডিজিটাল নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা। যে গ্রেট ব্রিটেন থেকে সমাজের প্রতিষ্ঠিত শিল্পী, লেখক আর পেশাদারদের নিয়ে ডকুমেন্টারি, ইন্টারভিউস আর নানা ওয়েব সিরিজ তৈরির মাধ্যমে তৈরি করেছেন একটি কার্যকরি প্লাটফরম, যা ব্রিটিশ কমিউনিটিতে পিছিয়ে থাকা শিল্পীদের শুধুই এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে না, বেকার শিল্পীদেরও কর্মসংস্থানের অনন্য সুযোগ তৈরি করে চলেছে। ব্ল্যাক মিউজিক অ্যাওয়ার্ড- এই সম্মাননার মাধ্যমে ইতিমধ্যে ১৫ জন উদীয়মান তরুণীকে সম্মানিত করেছে তারা।
১৪) কারলা মেরি উইলিয়ামস: গায়িকা হিসেবেই খ্যাতি তার, এ পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েদের ব্যন্ড দল প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছেন। শুধুই সুকণ্ঠি নন, নিত্যনতুন গান লিখে চলেছেন এ নবীন গীতিকার। যার সৃষ্টিকর্মের মাঝে আছে বিয়ন্সের ফ্রিডম, নটি বয়েজ-এর রান-ইন আর ব্রিটনি স্পিয়ার্সের প্রাইভেট শো। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জয় করেছেন ব্রিট অ্যাওয়ার্ড, ঝুলিতে আছে দু-দুটো গ্র্যামির মনোনয়ন।
n লেখক: ব্রিটিশ প্রবাসী
