ডলার-সংকট

‘শাঁখের করাতে’ টেকনাফ বন্দরের ব্যবসায়ীরা

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৩, ০২:২৫

ডলার-সংকটের কথা বলে সরকারি ব্যাংকগুলোতে লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) দেওয়া বন্ধ অনেক আগে থেকেই। কিন্তু ব্যবসা বন্ধ করতে পারেননি কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীরা। এ সময়ে মিয়ানমার থেকে আমদানি পণ্য খালাস করতে বেসরকারি ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে তাদের। বেসরকারি ব্যাংক হতে ফরেন ডিমান্ড ড্রাফট (এফডিডি) মাধ্যমে পণ্যের দাম পরিশোধ করতে গিয়ে ডলারের বিপরীতে সরকারি ঘোষিত দামের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এতে মিয়ানমার থেকে আমদানিকৃত আদা, মাছ, পেয়াজ, রসুনসহ সব পণ্যেরই দাম বাড়িয়ে বিক্রি করতে গিয়ে প্রশাসন ও স্থানীয়দের রোষানলে পড়ছেন তারা। ফলে ব্যবসায়ীদের এখন হয়েছে ‘শাঁখের করাতের’ অবস্থা।

সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীদের মতে, বেসরকারি ব্যাংকে এফডিডি দিতে ডলারের দাম ইচ্ছেমতো নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া দামের অতিরিক্ত ৭ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি না পেলে এফডিডি দেওয়া হয় না। অর্ডারে আসা মালামাল ছাড়াতে গেলে বাড়তি দামই দিতে হচ্ছে ডলারের।  সোম ও মঙ্গলবার ডলারের দাম ১০৬ টাকা ৯০ পয়সা থাকলেও টেকনাফে চলতি সময়ে এফডিডি দেওয়া একমাত্র এবি ব্যাংক ডলার প্রতি দাম রেখেছে ১১৫ টাকা ২৩ পয়সা। তবে, ১০৬ টাকা ৯০ পয়সার বাড়তি আদায় করা টাকার কোনো রশিদও দেওয়া হয় না। আবার এসব এফডিডিও আওয়ামী লীগের জেলার শীর্ষ নেতাসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্তাব্যক্তি, শীর্ষ জনপ্রতিনিধির তদবির ছাড়া পাওয়া দুষ্কর।

ডলারের দাম অতিরিক্ত বাড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পবিত্র রমজানে মিয়ানমার থেকে আমদানিকৃত আদা, মাছ, পেঁয়াজ, রসুনসহ সব কাঁচা পণ্যেরই দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে চরম বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।

টেকনাফ বন্দরের শীর্ষ ব্যবসায়ী মেসার্স ফারুক ট্রেডার্সের মালিক ওমর ফারুক বলেন, সোমবার একটি এফডিডিতে ২৯ হাজার ৯৪০ ডলারের বিপরীতে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এতে ডলারের দাম পড়েছে ১১৫ টাকা ২৩ পয়সা। কিন্তু আমাকে ১০৬ টাকা ৯০ পয়সার রশিদ দেওয়া হয়। এর পরও কাঁচা পণ্য নষ্ট হওয়ার ভয়ে যা চেয়েছে সেই দরেই এফডিডি নিতে বাধ্য হয়েছি।

তিনি আরো বলেন, ডলার-সংকট দেখিয়ে অনেক আগেই সোনালী ব্যাংক লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর থেকেই মূলত এ জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।

টেকনাফের আরেক ব্যবসায়ী আবু আহমদসহ অন্য ব্যবসায়ীরাও বলেন, এখন একমাত্র এবি ব্যাংকই এফডিডি দিচ্ছে। চাহিদার পরিবর্তে জোগান কম হওয়ায় সরকার নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত মূল্যে ডলার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ,  প্রতিদিন কম করে হলেও ১৭টি এফডিডি দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া দর থেকে ৭ থেকে ৯ টাকা বেশি নিয়ে প্রতিদিন ৩৫-৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এবি ব্যাংক। এতে পণ্যের দাম বেড়ে গিয়ে বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে।

শুধু তাই নয়, নিয়মিত এফডিডিও নেতাদের তদবির ছাড়া হয় না। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি দলের বড় নেতা বা আমলাদের তদবিরে এফডিডির সিরিয়াল আগে-পরে মেলে। এতে এসব তদবিরকারকদের ‘নজরানা’ দিতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। সব খরচ তুলে আনতে ভোক্তাদের পকেট কাটা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এবি ব্যাংক টেকনাফ শাখা যেন এক রাজনৈতিক কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন কোনো না কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ নেতারা এফডিডির তদবির নিয়ে যাচ্ছেন। আর এ সুযোগে অনৈতিকভাবে ডলারে দর বেশি রাখছে এবি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নেতা, জনপ্রতিনিধি বা বড় আমলার তদবির রক্ষা করতে গিয়ে সিরিয়ালে থাকা অনেক ব্যবসায়ী নিয়ম মতো এফডিডি পান না। সময়মতো এফডিডি না পেয়ে অনেক ব্যবসায়ীর কাঁচামাল ট্রলারেই নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

সালাম অ্যান্ড ব্রাদার্স’র স্বত্বাধিকারী আবদুস সালাম বলেন, আমি গত বছরের ডিসেম্বর এফডিডির সিরিয়াল পেয়েছিলাম। এরপর থেকে ডলার-সংকট দেখিয়ে আমাকে এখন পর্যন্ত আর সুযোগ দেওয়া হয়নি। তবে সরকার দলীয় নেতা দিয়ে যারা তদবির করছেন তারা নিয়মিত এফডিডির সুযোগ পাচ্ছে। চাহিদা বেশি থাকায় ডলার প্রতি বাজার মূল্যের চেয়ে ৭-৯ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দিতে হচ্ছে।

ডলারের দাম বাড়তি নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি এবি ব্যাংক টেকনাফ শাখার ম্যানেজার মনজুর আলম চৌধুরী। এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা জানতে হলে এবি ব্যাংক হেড অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

ইত্তেফাক/ইআ