ঔপনিবেশিকতা নিয়ে পশ্চিমে ‘অ্যান্টি কলোনিয়াল’, ‘ডিকলোনিয়াল’ এবং ‘পোস্ট কলোনিয়াল’ কথাগুলো চালু আছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার নাম। ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে আসে ব্রিটিশ, ফরাসি, স্প্যানিশ ও বেলজিয়ানদের কথা। ইউক্রেন ও তার মিত্ররা এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, রাশিয়া যে যুদ্ধ শুরু করেছে সেটি মূলত সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। সোভিয়েত ইউনিয়ন এখনো অনেকের স্মৃতিময় অতীত। অনেকের কাছে ইতিহাস। তরুণদের কাছে এর বিশেষ আবেদন নেই। বর্তমানে রুশ বিরোধী ঐক্য বা সংহতি গড়া সহজ নয়। কারণ ইতিহাসের আলোকে ঔপনিবেশিকতার সঙ্গে রুশদের তুলনায় পশ্চিমারাই এগিয়ে।
বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন ইউক্রেনের সাংবাদিক ম্যাক্সিম এরিস্তাভি। তিনি রুশ ঔপনিবেশিকতার প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে ইউক্রেনীয়দের দুর্দশা মধ্য এশিয়ার অন্যান্য দেশের লোকজন সহজে বুঝবে। সোভিয়েত আমলের অভিজ্ঞতা তাদের অনেকের স্মৃতি থেকে এখনো মুছে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক পিটজার কলেজের প্রফেসর আজামাত জুনিসবাই বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল সাবেক রুশ সাম্রাজ্যেরই উত্তরসূরি। এই দেশ মধ্য এশিয়া রুশ শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছে দশকের পর দশক। কিন্তু তাদের গায়ে ঔপনিবেশিকতার তকমা লাগেনি। বরং এমন ভাবমূর্তিই তৈরি হয় যে, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ রুখতে তারাই অগ্রসেনানী। সোভিয়েত আমলে বর্তমান রুশ ফেডারেশন রাশিয়ান সোভিয়েত ফেডারেটিভ সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক (আরএসএফএসআর সংক্ষেপে এসএফএসআর) নামে পরিচিত ছিল। রুশরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ওপর তারা প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছে। জুনিসবাই কাজাখস্তানে বেড়ে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে সবসময় এমন ধারণা হতো যে, রুশরা আমদের শাসন করছে। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসক হিসেবে রাশিয়ার নাম কখনো আসতো না।’ সময়ের সঙ্গে মানুষের মনে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে। তিনি বলেন, রুশ আগ্রাসন অনেক কাজাখের মধ্যে ঔপনিবেশিকতা বিরোধী মনোভাব তৈরি করেছে। দেশটির প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাবেক সোভিয়েত আমল নিয়ে যে একটি দুর্বলতা ছিল তা প্রায় মুছে দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ উসকে দিচ্ছে আঞ্চলিক ঔপনিবেশিকতা বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ইউনিভার্সিটি অব বাসেলের আধুনিক ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক বোতাকজ কাসিমবেকোভা মনে করেন, পূর্ব ইউরোপ ও ইউরেশিয়ার ইতিহাসও যে ঔপনিবেশিকতার বাইরে নয় পশ্চিমারা সেটা উপলব্ধি করে না। তার মতে, পশ্চিম ইউরোপীয় না হওয়ায় ঔপনিবেশিক শক্তি রাশিয়া তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
বেলারুশের মিডিয়া কর্মী মারিয়া ইয়োরিওমা বলেন, ‘ইউক্রেনে রাশিয়া যুদ্ধ শুরু করার পর তার দেশের গণতন্ত্রপন্থিদের কাছে ঔপনিবেশিতার ধারণাটি আবারও সামনে এসেছে। যদিও এ নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা আগে ছিল না। কিন্তু ইউক্রেনীয়দের দুর্দশা এখন অতীতের স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা শুরু হয়েছে।’ বেলারুশের স্বেচ্ছাসেবী ইনগা ও আলিনা তাদের দেশ ছেড়ে পোল্যান্ড এসেছেন শুধু ইউক্রেনের লোকজনের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। রাশিয়া যা করছে তা বোঝাতে তারাও এখন ঔপনিবেশিকতা শব্দ ব্যবহার শুরু করেছে। অথচ এটি এ যাবৎ একাডেমিক পরিমণ্ডলের বাইরে কমই ব্যবহার হয়েছে। সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র জর্জিয়ার সাংবাদিক ও ওপেন ককেশাস মিডিয়া আউটলেটের পরিচালক মারিয়াম নিকুরাদজে বলেন, ২০০৮ সালে তারা রুশ হামলার শিকার হওয়ার পরেওকলোনিয়ালিজম শব্দ ব্যবহার করেননি। জর্জিয়া যদিও তখন রাশিয়ার সরাসরি সামরিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। জর্জিয়ার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক একা জিগাওরি বলেন, তারা বরং ঔপনিবেশিকতার চেয়ে দখলদারিত্ব শব্দের সঙ্গেই বেশি পরিচিত। শব্দ দুটো অনেকটা একই রকম অর্থ প্রকাশ করলেও ঔপনিবেশিকতার ব্যপ্তি অনেক বেশি।
ইউক্রেনের প্রতিবেশী বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো অবশ্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সমর্থন করে যাচ্ছেন। বেলারুশের সাংবাদিক ও অধিকারকর্মী হানা লিউবাকোভা বলেন ‘এটি রুশ ঔপনিবেশিকতারই ধারাবাহিকতা মাত্র’। দেশটিতে গণতন্ত্রপন্থিরা মাঝে মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠলেও এখনো তেমন সুবিধা করতে পারেনি। ঔপনিবেশিকতা বিরোধী মনোভাব ভবিষ্যৎ আন্দোলনে প্রেরণা যোগাতে পারে। সম্প্রতি দেশটিতে পরমাণু বোমা বসানো হয়েছে। এথেকে নতুন পরমাণু বিতর্কের জন্ম হতে পারে।
এরিস্তাভির কথায় আসি। তার প্রশ্ন, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক ঐক্য ধরে রাখতে উপনিবেশ বিরোধিতা কতটুকু কাজে লাগবে। বেলারুশ, আর্মেনিয়া ও কাজাখস্তান এখনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে মস্কোর ওপর নির্ভরশীল। এছাড়াও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নানা বিষয়ে মতভেদ মতপার্থক্য রয়েছে। স্বয়ং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জোলনস্কি সম্প্রতি বলেছেন, ‘ইউক্রেন ইউরোপের অংশ। এটি আমাদের ইউরোপ। আমাদের জীবনধারা’। তিনি ইউক্রেনীয় পরিচয় থেকে ইউরোপীয় পরিচয় প্রাধান্য দিচ্ছেন। আঞ্চলিক ঐক্যপ্রতিষ্ঠায় অভিন্ন ইস্যু আসলেই কার্যকর কি না, জেলেনস্কি নিজেই সেই বিতর্কে ঘি ঢাললেন।
