হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই রাজশাহীর মোহনপুরে চলছে কৃষিজমিতে পুকুর খননের হিড়িক। হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি ছাড়াও খাল, বিল, নালাসহ পানি নিষ্কাশনের স্থানগুলো দখল করে চলছে বাণিজ্যিক পুকুর খনন। এতে ফসলি জমে কমে যাওয়াসহ জলাবদ্ধতায় ফসল নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এভাবে নির্বিচারে পুকুর খননের কারণে বর্ষা মৌসুমে উঁচু জমির ফসলহানির পাশাপাশি জলাবদ্ধতা ঝুঁকিতে পড়েছে কয়েকশ বাড়িঘর। তবে অনেক পুকুর খননকারীর দাবি- আগ্রহী কৃষকদের অনুরোধে প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই পুকুর খনন করা হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত পরিমাণ পুকুর খনন বন্ধ করতে গত ১০ মার্চ উচ্চ আদালতের ২৪৭৬ নং রিট পিটিশনের আলোকে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানওয়ার হোসেন। তারপরও পুকুর খনন বন্ধ হচ্ছে না। এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরদারির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কৃষি অধ্যুষিত হিসেবে পরিচিত মোহনপুর উপজেলায় মোট আবাদি ভূমির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর। পুকুর খননের কারণে দুই বছরের ব্যবধানে ফসলি জমি কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৩২০ হেক্টরে। প্রতিবছর পুকুর খননের পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণ হচ্ছে। এভাবে পুকুর খনন চলতে থাকলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আবাদি জমি ফুরিয়ে আসবে বলেও মন্তব্য অনেকের।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলায় চলছে বিশাল আয়তনের প্রায় ১০টি পুকুর খননের কাজ। প্রতিটি পুকুরের আয়তন প্রায় ২০ থেকে ৮০ বিঘা পর্যন্ত। দিনরাত চলছে প্রায় অর্ধশতাধিক মাটি কাটা যন্ত্র। চলতি বছর ইতিমধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক পুকুর খননের কাজ শেষ হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পানি প্রবাহের সকল পথ উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা উপেক্ষা করেই খাল-বিলসহ সব ধরনের ফসলের জমি দখল করে একাধারে পুকুর খননের কারণে চরম জলাবদ্ধতায় দিন দিন দ্বিগুণ হারে বাড়ছে ফসলহানির পরিমাণ। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে উপজেলায় সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক পুকুরের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার ৬১৮টি। একবছরেই পুকুরের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০৫টি।
মোহনপুর উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান মেহবুব হাসান রাসেল বলেন, ফসলি জমি নষ্ট করে সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে একের পর এক পুকুর খনন চলতে থাকলে খাদ্য সংকটসহ চরম জলাবদ্ধতায় পানিবন্দি হয়ে পড়বেন উপজেলার মানুষ।
উপজেলার বাকশৈল গ্রামের কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, মগরা বিলে তিন ফসলি জমিতে পুকুর করে বিলের আবাদি জমি প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন খাল দখল করে পুকুর খননের কারণে উপরের জমিতে পানি জমে থাকার জন্য কোনো ফসল হচ্ছে না। এভাবে দুই বছর ধরে তাদের চাষ করা হাজার হাজার বিঘা জমির আউশ ধান ডুবে বিনষ্ট হচ্ছে।
জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রহিমা খাতুন বলেন, ছোট আয়তনের উপজেলা মোহনপুরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পুকুর খনন করা হয়েছে। ফলে কৃষি জমির পরিমাণ কমেছে। হুমকির মুখে পড়ছে কৃষিপ্রধান ফসল পান ও ধান চাষ।
কেশরহাট পৌরসভার মেয়র শহিদুজ্জামান শহিদ বলেন, কৃষি ও কৃষক বাঁচাতে সকলকে সচেতন হতে হবে। অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানওয়ার হোসেন বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশে অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। নতুন কোনো পুকুর খননের অভিযোগ পেলে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিদায়ী জেলা প্রশাসক বলেন, অবৈধ পুকুর খননের খবর পেলেই জেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবে।
