সকালবেলাতেই ডাকাডাকি! চিত্কার চেঁচামেচি! হাঁকডাক!
যেন বাড়িতে বিশাল কিছু হতে যাচ্ছে। তোতন বিছানায় শুয়ে শুয়েই দেখল আব"ু গামছা কাঁধে নিয়ে বাথরুমে গোসল করতে ঢুকল।
বড়বোন নোতন রান্নাঘরে একবার ঢুকছে আর বের হচ্ছে। কাজের বুয়া এখনো আসেইনি। আম্মু নিজেই ঘর ঝাড়ু দিতে লেগে গেছে।
আব্বু বাথরুম থেকে চেঁচিয়ে বলল, ‘আমার লুঙ্গিটা দাও।’
—নিজেই নিয়ে নাও। দেখছ না আমি কাজে ব্যস্ত।
তোতন চোখ বন্ধ করেই মুচকি হাসল। বাথরুম থেকে আম্মুকে দেখতে পাওয়ার কথা নয়। তাহলে আব্বু দেখবে কীভাবে আম্মু কাজ করছে।
‘তোতন উঠে পড়।’ রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল নোতন।
—আহ্! বেচারিকে ডাকিস না। ঘুমাক একটু। তুই বরং তাড়াতাড়ি তরকারিটা নামিয়ে নে।
আবারও মুচকি হাসল তোতন। বড় আপু ওর পিছনে সারাদিন লেগে থাকে। আর আজ ওর জন্যই মা আপুকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে।
একটুপরই আব্বু বাথরুম থেকে বের হয়ে চিত্কার করে বলল, ‘তাড়াতাড়ি নাস্তা দাও।’
আম্মু অমনি মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, ‘আহা! মনে হচ্ছে তোমারই পরীক্ষা!’
—আমারই তো। আমার মামণির পরীক্ষা মানে তো আমাদেরই পরীক্ষা, তাই না?
—মেয়েকে সারাদিন একদণ্ড তো পড়াতে বসাও না। আবার বড় বড় কথা!
আব্বু-আম্মুর কথা শুনে তোতনের মনে পড়ল, আজ ওর পরীক্ষা।
আম্মু বলল, ‘পিএসসি পরীক্ষা।’
‘আম্মু ওটা পিএসসি হবে না। পিএসসি মানে তো পাবলিক সার্ভিস কমিশন। ওটা হবে পিইসি—প্রাইমারি এক্সামিনেশন সার্টিফিকেট বুঝলে।’ বুঝদারের ভঙ্গিতে বলেছিল আপু।
‘মোটেও না, পিইসি মানে প্রাইমারি এডুকেশন কমপ্লিশন।’ আপুর হাসিতে ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়েছিল তোতন।
‘থাক থাক, আমাকে আর শেখাতে হবে না।’ আম্মু গজগজ করতে করতে বলেছিল।
ঢং করে আটটা বাজল ঘড়িতে।
বর্তমানে ফিরে এলো তোতন। একটু পরই আম্মু তোতনকে ঘুম থেকে উঠিয়ে মুখ ধুইয়ে দিল। দাঁত মেজে দিল। স্নান করিয়ে স্কুলের ড্রেস পরিয়ে দিল।
ইশ! সারাবছর বকাবকি আর আজকে এত আদর!
প্রতিদিনই কেন পরীক্ষা হয় না। ভাবল তোতন।
একটুপরই তোতনকে খাওয়াতে শুরু করল আম্মু। ফাঁকে ফাঁকে দিতে শুরু করল উপদেশ।
‘পরীক্ষা হলে কারো সাথে কথা বলবে না।
কারো দেখে দেখে লিখবে না।
নিজের প্রবেশপত্র, কলম সব যেন ঠিক থাকে-হারায় না।
যেসব স্যাররা গার্ড দেবে তাদের সাথে মুখে মুখে জবাব দেবে না।
নিজে যা যা পারবে তাই লিখবে।
কোনো প্রশ্ন ছেড়ে আসবে না। অন্যকে কোনো কিছু শিখিয়ে দেবে না।
আর তোমার আব্বুু যেখানে বসিয়ে দিয়ে আসবে সেখানেই বসে থাকবে। অন্য কোথাও যাবে না।’
আরও একগাদা উপদেশ ডাল-ভাত আর মুরগির মাংসের সাথে গিলে আব্বুর সাথে পরীক্ষা হলের উদ্দেশে রওয়ানা হলো তোতন। ভিতরে ভিতরে টগবগ করে ফুটছে। সত্যিই তাহলে বড় হতে যাচ্ছে ও।
প্রথম দিন হিসেবে সব অভিভাবককেই বাচ্চাদের সাথে স্কুলে ঢুকতে দিল কর্তৃপক্ষ। তোতনের সিট খুঁজতে তেমন কোনো বেগই পেতে হলো না আশরাফ আলীকে।
তোতনকে সিটে বসিয়ে কিছুক্ষণ মেয়ের পাশেই থাকলেন।
অভিভাবকদের ভিড় বাড়ছে। মেয়েটাকে ছেড়ে যেতে মন চাইছে না। ক্লাসরুমের বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন তিনি। আরও কিছুক্ষণ পরীক্ষা কেন্দ্রে দাঁড়ানো যাবে।
সেদিনের ছোট্ট তোতন দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল।
পুলিশের হুইসেল শুনে সম্বিত্ ফিরে পেলেন আশরাফ। এবার স্কুুলের বাইরে যেতেই হবে। তোতনকে অভয় দেওয়ার জন্য আরেকবার শ্রেণি কক্ষে ঢুকলেন বাবা।
নেই!
সিটে বসে নেই তোতন!!
ছ্যাঁত্ করে উঠল বাবার বুক। আশপাশের মেয়েগুলোকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি। কেউ বলতে পারল না।
একটু পরই হাঁপাতে হাঁপাতে সিটে এসে বসল তোতন।
—কোথায় গিয়েছিলে মা। বাথরুমে?
—না আব্বু। সোহানাকে ওর সিটে বসিয়ে দিয়ে এলাম।
—তুমি কেন? ওর আব্বু-আম্মু সাথে ছিল না।
—ছিল তো। আমি ওদেরকে হেল্প করলাম। আমি কি হেল্প করতে পারি না?
দুই.
বাসায় ফেরার পর পরীক্ষা কেমন হলো তার হিসাব দিতে হলো তোতনকে।
তোতনের জবাব ছিল এরকম,
‘আমি কারো সাথে কথা বলিনি। পাশে বসা মেয়েগুলো আমার সাথে কথা বলছিল।
আমি কারো দেখে দেখে লিখিনি। ওরাই আমার খাতা দেখে লিখেছে।
আমি কোনকিছু হারাইনি। তবে আমার পাশে বসা সুনয়নার সুন্দর কলম আর স্কেলটা আমার সাথে ভুলে চলে এসেছে।
সামনে বসা কবরীর প্রবেশপত্র আমার কাছে থেকে গেছে।
রুমে থাকা শিক্ষকদের কাছ থেকে আমি ইশারায় পানি খেতে চেয়েছি। একজন শিক্ষক আমার নাম জানতে চেয়েছিলেন, আমি বলিনি। শুধু হেসেছি।
আমার পরীক্ষা তো দু ঘণ্টাতেই শেষ। তাই আমি পাশের একটি মেয়ের খাতায় উত্তর লিখে দিয়ে বাকি সময়টা পার করেছি।
আমি কাউকে কিছু শিখাইনি। অন্যরা আমাকে দু-একটা প্রশ্নের উত্তর শিখিয়ে দিয়েছে।
কোনো প্রশ্নই ছেড়ে আসিনি। পাশের সিটে বসা দুজনের প্রশ্নপত্রই আমি চুপ করে সাথে নিয়ে এসেছি, ওরা টেরই পায়নি।
আব্বু যেখানে বসিয়ে দিয়েছিল সেখানে বসে থাকতে পারিনি। কারণ পরীক্ষা শেষে সবাইকে হল থেকে বের করে দিয়েছে স্যাররা। g
