সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ইরাক যুদ্ধ শেষ হয়নি এখনো!

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৩, ০৭:২৭

ইরাক যুদ্ধ শেষ হয়েছে ২০ বছর হলো। দেশটি এখনো যুদ্ধের জের টেনে চলেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন দুইটি যুদ্ধ মোকাবিলা করেন। একদিকে ছিল ইরাক অন্যদিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ২৮-৩০টি দেশের বহুজাতিক জোট। প্রথম যুদ্ধ হয় ১৯৯১ সালে কুয়েত থেকে ইরাককে হটাতে দ্বিতীয়টি হয় ২০০৩ সালে সাদ্দামের ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র সংগ্রহের অভিযোগ তুলে। অভিযোগটি যে ভুয়া ছিল তা প্রায় সব আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানেই প্রমাণিত হয়।

২০০৩ সালের ২০ মার্চ দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরুর পর ৯ এপ্রিল সাদ্দাম ক্ষমতাচ্যুত হন। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়নি। বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী লড়াই চালিয়ে যায়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীও সাধারণ মানুষের ওপর সময় সময় হত্যাযজ্ঞ চালায়। মার্কিন ও ব্রিটিশ বাহিনীর যুদ্ধবন্দি নির্যাতনের গা শিউরে ওঠা সব ছবি প্রকাশ পেতে থাকে। সমালোচনার ঝড় ওঠে বিশ্ব জুড়ে। একনায়ক সাদ্দামকে হটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বারবার বলা হয়। পশ্চিমাদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ইরান দেশটির ওপর প্রভাব বিস্তার শুরু করে।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে ইরাক। দেশটির তরুণরা এখন জনসংখ্যার বড় একটি অংশ। সাদ্দাম তাদের কাছে দূর অতীত। পশ্চিমাপন্থি অথবা ইরানপন্থি শাসকরা তাদের আইডল নয়। তারা চায় সবাইকে নিয়ে নতুন দেশ গড়তে। ২০০৩ সালে সাদ্দামের পতনের পর ধারণা করা হয়েছিল, দেশটি বিশৃঙ্খলায় হারিয়ে যাবে। শিয়া, সুন্নি ও কুর্দিরা মিলে দেশ তিন ভাগ করে ফেলবে। ২০০৩ থেকে ২০০৭-৮ সাল পর্যন্ত অবস্থা অনেকটা সেরকমই ছিল।

ইরাকে সাদ্দাম-পরবর্তী প্রথম নির্বাচন হয় ২০০৫ সালে। ক্ষমতায় আসেন নুরি আল মালিকি। তখন জনসংখ্যা ছিল আড়াই কোটি। ২০২২ সালে হয় ৪ কোটি ২০ লাখ। জনসংখ্যা বাড়লেও নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমে। ২০২১ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪১ শতাংশ। বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থাই এর কারণ। জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে। এরা টিকটক প্রজন্ম। এদের অনেকেই কর্মহীন। দেশ নিয়ে তাদের প্রত্যাশা প্রবীণরা যে পূরণ করতে পারবে না তা বলাই বাহুল্য। কর্মসংস্থানই এই মুহূর্তে তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। এরপর তাদের চাওয়ার মধ্যে আছে সরকার ও রাজনৈতিক সংস্কার, শিক্ষা, নারী অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরক্ষা জোরদার করা। এগুলো পূরণ করতে হলে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি এমনভাবে জেঁকে বসেছে যে, তাদের পক্ষে কোনো সংস্কার করা সম্ভব নয়। সংস্কার আনতে হবে নির্বাচন ব্যবস্থাতেও। সাদ্দাম- পরবর্তী সময়ে এমন একটি নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হয়েছে যে, শিয়া, সুন্নি ও কুর্দি পার্টি থেকে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতাসীনদের বাছাই করা হবে এবং এদের মধ্যে একটি ভারসাম্য রাখা হবে। এছাড়া সংস্কার প্রয়োজন বিচার ব্যবস্থাতেও।

২০২১ সালের অক্টোবরের পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অনেক কম ভোট পায়। এর কারণ সম্ভবত দুই বছর ধরে চলা তরুণদের আন্দোলনের ফসল। তিশরিন নামে পরিচিত ঐ আন্দোলন শক্তি প্রয়োগ করে দমন করা হলেও এটি শাসক শ্রেণির ভিত কাঁপিয়ে দেয়। আন্দোলনে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল ছয় শতাধিক, আহত হয় অনেকে। তারপরও এটি মোটামুটি সফল আন্দোলন। এর আগে ২০১১ সালে আন্দোলন হলেও সেটি কোনো ফল বয়ে আনেনি। কিন্তু তিশরিন আন্দোলন রাজনীতিকদের প্রতি সাধারণ মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে পেরেছে। শিয়া-সুন্নি বা কুর্দি নয়, তরুণরা চায় মেধা ভিত্তিক রাজনীতি। তিশরিন মুভমেন্টে অংশগ্রহণকারীরা পরবর্তী রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়ে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। নভেম্বরে প্রাদেশিক নির্বাচনেও তারা অংশ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইরাক কি কেবলই ব্যর্থতার উপাখ্যান? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয়রা তাদের দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। দেশটির বর্তমান দুর্ভোগের জন্য তারা অনেকাংশে দায়ী। বর্তমানে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তাকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে তাদের সহযোগিতা করা উচিত। গত ২০ বছরে দেশটির অভ্যন্তরে অনেক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে পশ্চিমা গণমাধ্যমে তা গুরুত্ব পায়নি। যুদ্ধের বার্ষিকী ছাড়া ইরাককে তারা স্মরণ করে না। তবে দেশটি ধ্বংসের মধ্যে এগিয়ে চলেছে এবং এগিয়ে যাবে এটিই এখন বাস্তবতা।

ইত্তেফাক/এএইচপি