শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

পাহাড়ে উৎসবের আমেজ, জলে ভাসলো মঙ্গলের ফুল

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৩, ১৪:০৯

পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর তিন দিনব্যাপী বৈসাবি উৎসব শুরু হয়েছে। রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই ও ত্রিপুরাদের বৈসুক উৎসব শুরু হয়। 

বুধবার (১২ এপ্রিল) সকালে নারীরা বাগান থেকে ফুল ও নিমপাতা সংগ্রহ নিয়ে একে-একে চলে আসে কাপ্তাই হ্রদে। সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ প্রার্থনা করে কাপ্তাই হ্রদে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে জলে ফুল ভাসিয়ে উৎসবের সূচনা করেন।

ছবি: ইত্তেফাক
এদিকে রাঙ্গামাটির গর্জনতলীতে ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে ত্রিপুরাদের বৈসুক উৎসবের উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার। 

ছবি: আশরাফুল ইসলাম শিমুল
এসময় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অংসুইপ্রু চৌধুরী, জেলা পরিষদ সদস্য বিপুল ত্রিপুরা, ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সভাপতি বিদ্যুৎ শংকর ত্রিপুরাসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে রাঙ্গামাটি রাজবাড়ী ঘাটে বৈসাবি উদযাপন কমিটি উদ্যোগে ভোরে গ্রামের তরুণ-তরুণীরা ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে ৩ দিন উৎসবের সূচনা করা হয়। রাজবাড়ী ঘাটে বৈসাবি উদযাপন কমিটির উদ্যোগে ফুল বিজুর উদ্বোধন করেন বৈসাবি উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক প্রকৃত রঞ্জন চাকমা, সদস্য সচিব ইন্টু মনি চাকমাসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ছবি: আশরাফুল ইসলাম শিমুল

ফুল ভাসানো দেখতে আসা এক বাঙ্গালি নারী আর্জিয়া আলম বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক উৎসব বৈসাবি যেন সকল সম্প্রদায়ের উৎসব। ফুল ভাসাতে এসে এখানে মনে হচ্ছে না আমরা বাঙালি। আমাদের মনে হচ্ছে আমরাও এদের একজন।’ 

ছবি: আশরাফুল ইসলাম শিমুল

বিজু, বৈসু, সাংগ্রাইং ২০২৩ উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ইন্টু মনি চাকমা জানান, করোনার কারণে গত দুই বছর উৎসব না করলেও রাঙ্গামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলায় এবছর উৎসবের উচ্ছ্বাস বয়ে যাচ্ছে। এই ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়েই শুরু হচ্ছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর তিন দিনব্যাপী প্রধান সামাজিক উৎসব বিজু। বৃহস্পতিবার মূল বিজু পালিত হয়। শুক্রবার গোজ্যেপোজ্যে (গজ্জ্যা পুজা) দিন পালিত হবে যার যার ঘরে।

ছবি: আশরাফুল ইসলাম শিমুল

রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অংসুইপ্রু চৌধুরী বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের সকল সম্প্রদায়ের প্রাণের উৎসব বৈসাবি উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে পাহাড়ের প্রতিটি ঘরে ঘরে আনন্দ বয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের ফলে পাহাড়ের সকল সম্প্রদায়ের মাঝে ভ্রাতৃত্ব বোধ সৃষ্টি হয়েছে। সেই সাথে পার্বত্য অঞ্চলের এই উৎসবের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলে সকল সম্প্রদায়ের মাঝে সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় হবে। পার্বত্য অঞ্চলের সকল সম্প্রদায় যাতে এক হয়ে সন্দুর একটি আগামীর বাংলাদেশ গড়তে পারে সেই দিকে আমাদের সকলের প্রত্যাশা থাকবে।’ 

ছবি: আশরাফুল ইসলাম শিমুল

সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার দেশে রূপান্তর করেছেন। 
সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূল অংশ। পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল সম্প্রদায়ের বসবাস। এখানে বাঙ্গালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, পাংখোয়া, বমসহ বিভিন্ন সম্প্রদায় বসবাস করে। আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে পাহাড়ের মানুষও উজ্জীবিত।’ 

ছবি: আশরাফুল ইসলাম শিমুল

পার্বত্য চট্টগ্রামের ১২টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা নবর্ষকে বিদায় জানানোর এ অনুষ্ঠান তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে বিবেচিত। এই উৎসব চাকমা জনগোষ্ঠী বিজু নামে, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী মানুষ সাংগ্রাই, মারমা জনগোষ্ঠী মানুষ বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী বিষু, কোনো কোনো জনগোষ্ঠী বিহু নামে পালন করে থাকে। 

ছবি: আশরাফুল ইসলাম শিমুল

১৩ এপ্রিল আর চৈত্র সংক্রান্তির দিনকে বলা হয় মূল বিজু। এদিন ঘরে ঘরে রান্না হয় ঐতিহ্যবাহী খাবার পাঁচন। তা দিয়ে দিন ভর চলে শুধু অতিথি আপ্যায়ন। ১৬ এপ্রিল থেকে সপ্তাহব্যাপী সাংগ্রাই জলোৎসবের মধ্য দিয়ে পাহাড়ে বৈসাবি উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। বৈসাবি উৎসবের আনন্দ উচ্ছ্বাস পাহাড়ের সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি আর সৌহাদ্য বাড়বে এমন প্রত্যাশা সকলের।

ইত্তেফাক/এসজেড