এ এ মাসুম
১৯৭১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ৪৯টি বাজেটের মধ্যে ২১টিই আওয়ামী লীগ সরকারের। এর মধ্যে বর্তমান সরকারের টানা তিন মেয়াদে ১১টিসহ মোট ১৭টি বাজেটই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ১৩ জুন, ২০১৯ বিকালে জাতীয় সংসদে দেশের ৪৯তম বাজেট পেশ করেন। ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ : সময় এখন বাংলাদেশের’ শিরোনামে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে বড় আয়ের উত্স ধরা হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর থেকে। এ খাত থেকে আয় ধরা হয়েছে শতকরা ৬২ দশমিক ২ শতাংশ বা প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। এ ছাড়াও মোট বাজেটের শতকরা দশমিক ৮ শতাংশ বা প্রায় ৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক অনুদান থেকে। বৈদেশিক ঋণ থেকে আসবে শতকরা ১২ দশমিক ২ শতাংশ বা প্রায় ৬৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ঋণ থেকে আসবে শতকরা ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ বা প্রায় ৭৭ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপির ৫ শতাংশ ঘাটতি রেখেছেন অর্থমন্ত্রী। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি দাঁড়াবে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি। ঘাটতি অর্থায়নে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে। এর মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকা অর্থায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে শিল্প স্থাপনে অপ্রদর্শিত আয় থেকে বিনিয়োগের অর্থের ওপর ১০ ভাগ হারে কর প্রদান করা হলে ওই বিনিয়োগকৃত অর্থের উত্স সম্পর্কে আয়কর বিভাগ থেকে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা হবে না। প্রস্তাবিত বাজেটে ফ্ল্যাট ও জমি কেনার ক্ষেত্রে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
‘রাজহাঁস থেকে পালক উঠাও যতটা সম্ভব ততটা, তবে সাবধান- রাজহাঁসটি যেন কোনোভাবেই ব্যথা না পায়’— ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের অর্থমন্ত্রী জিন ব্যাপটিস্টে কলবার্টের এই বিখ্যাত উক্তি উচ্চারণ করলেন অর্থমন্ত্রী। আর এ নীতি অনুসরণ করেই এক কোটি লোককে ‘করজাল’-এর আওতায় আনার ঘোষণা দিয়ে বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছেন। ব্যক্তি শ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির দাবি থাকলেও প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা চলতি অর্থবছরের মতো আড়াই লাখ টাকাই আছে।
অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, ব্যাংক থেকে কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ গ্রহণ করে ঋণ শোধে ব্যর্থ হলে তার জন্য কোনো প্রকার ‘এক্সিট’-এর ব্যবস্থা ছিল না। আমরা এবার এই কার্যক্রমটি আইন প্রক্রিয়ায় সুরাহার লক্ষ্যে একটি কার্যকর ইনসলভেন্সি আইন ও ব্যাংক্রাপ্টসি আইনের হাত ধরে ঋণ গ্রহীতাদের এক্সিটের ব্যবস্থা নিচ্ছি। অন্যদিকে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, যেসব ঋণগ্রহীতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন পরিশোধ না করার জন্য (ইচ্ছাকৃত খেলাপি) সেই ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ঘোষণা এই বাজেটে দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোবাইল ফোনে কথা বলার ওপর খরচ বাড়ানো হয়েছে। এতে মাশুল গুনতে হবে একেবারেই নিম্ন স্তর থেকে শুরু করে উচ্চ স্তরের মানুষকে। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে গ্রামের সাধারণ নিম্ন স্তরের মানুষই।
আগামী অর্থবছরে পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের করমুক্ত লভ্যাংশ আয়ের সীমা ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়াতে আগামী অর্থবছর থেকে তৈরি পোশাকের বাকি সব খাতের জন্য এক শতাংশ রপ্তানি প্রণোদনার প্রস্তাব করা হয়েছে এ বাজেটে। প্রবাসী আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে বাজেটে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রবাসী কর্মীদের বিমা সুবিধায় আনার কথাও বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বরাদ্দ ২০ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে তার মোট কর্মীর মধ্যে ১০ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে নিয়োগ দিলে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রদেয় করের পাঁচ শতাংশ মওকুফ করবে সরকার।
বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৮ দশমিক প্রবৃদ্ধি ১৩ শতাংশ এবং মাথপিছু আয় ২১৭৩ ডলার প্রাক্কলন করা হয়েছে। এছাড়া নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতির চাপ ৫ দশমিক ৫ শতাংশে রাখার প্রস্তাব করা, আর বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৪ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে চারটি নতুন খাতে বরাদ্দ আসছে ২৩৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এগুলো হচ্ছে-নদী ভাঙা ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ১০০ কোটি টাকা, দরিদ্র মানুষের সুদমুক্ত ক্ষুদ্র ঋণ খাতে ৬৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ৫০ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের জন্য ২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বাজেটে দেশের সবার জন্য পেনশনের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সরকারি যে পেনশনের পাশাপাশি দেশের সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের সব কর্মীকে ক্রমান্বয়ে পেনশন সুবিধার আওতায় আনতে শিগগিরই ইউনিভার্সাল পেনশন অথরিটি গঠন করা হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজেটে গতানুগতিক অনেক বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে, ফলে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ দেখা দিবে। তাছাড়া, বড় ধরনের একটা ঘাটতি রয়েছে তা মোকাবিলায় সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা পূরণ করবে। এটা করা হলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নিরুত্সাহিত হবে। দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ বাড়বে। তাই স্থিতিশীলতা, বৈষম্য নিরসন, প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বাজেট বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট খাতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করতে হবে।
ছবি: ইন্টারনেট
