নিরাপদ খাদ্য উত্পাদন ব্যবসা এবং আগামী প্রজন্ম

আপডেট : ২১ জুন ২০১৯, ১৯:৪৮

কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান

জ্ঞা ন-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এতো সুবিধা আবিষ্কার হবার পরেও খাদ্য নিরাপদ করার ক্ষেত্রে আমরা তিমিরেই রয়ে গেছি। অর্থনীতিতে আমাদের দেশের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে মানুষের মুখে একমুঠো ডাল-ভাত দেয়াই ছিল রাষ্ট্রের অনেক বড় চ্যালেঞ্জ, তাই নিরাপদ অনিরাপদ নিয়ে আমরা কেউ তখন বেশি মাথা ঘামাইনি। এখন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। তাই খাদ্য উত্পাদনে প্রযুক্তির ব্যবহারও আধুনিক কৃষি পরিচর্যা হয়েছে অত্যাবশ্যকীয়। ফলে চাহিদা পূরণে উন্নতজাতের ফসল, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ, রাসায়নিক সার, বালাইনাশক, প্রক্রিয়াজাতকৃত পশুখাদ্য, ভেটেরিনারি ড্রাগ ইত্যাদি আমাদের খাদ্য উত্পাদনে ব্যবহার করতে হচ্ছে। আমদানি নির্ভর কৃষি উপকরণের কোম্পানী হয়েছে, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহদাকার শিল্প-কল-কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে বাজারে খাবার সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এত অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি যে ধরনের অবকাঠামো তৈরি করা দরকার ছিল তা হয়নি, মান নিয়ন্ত্রণের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া, ল্যাব ও জনবল না রেখেই যেন-তেনভাবে বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফলে মানবদেহের ও পরিবেশের জন্য প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো নিরূপণ না করেই কৃষি উত্পাদন হচ্ছে। শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না রেখেই হচ্ছে পণ্য উত্পাদন। পৃথিবীর মধ্যে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক রাষ্ট্রের মধ্যে অন্যতম একটি দেশ বাংলাদেশ। দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনৈতিক রাষ্ট্রেও একটি নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত করা চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। ফলে ধনি-গরিবের মধ্যে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির কারণে সীমিত মানুষে রাষ্ট্রীয় সুযোগ ভোগ করে। তাই অগ্রাধিকার মৌলিক বিষয়গুলো চিহ্নিত করে স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। আমাদেরকে তাই সবার আগে খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ-পুষ্টিকর খাবার ও পরিবেশ সংরক্ষণ জাতীয় সামাজিক আন্দোলন হিসেবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চয়তার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তাই খাদ্য উত্পাদনের প্রাথমিক স্তর যেমন কৃষি খামার থেকে শুরু করে খাদ্য পরিবেশন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরকেও সনাক্ত করতে হবে যে, খাদ্য কিভাবে অনিরাপদ হয় এবং খাদ্য অনিরাপদ হওয়ার সম্ভব্য প্রতিটি স্তর নিয়ে দেশের বিশিষ্ট গবেষক, শিক্ষাবিদ, সম্প্রসারণবিদ, পরিবেশবিদ, ব্যবসায়ী সংগঠন, গণমাধ্যম, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও জনপ্রতিনিধিকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান আবিষ্কার করতে হবে। খাদ্য অনিরাপদ হবার সম্ভাব্য কারণ নিয়ে সাধারণ আলোচনা করলে দেখা যায় তিনটি প্রধান বিষয় নজর দেয়া জরুরি—

১) উত্পাদনের প্রাথমিক স্তরের ত্রুটি চিহ্নিতকরণ: ফসলি জমিতে চাষ শুরু করার পূর্ব থেকে শস্য মাড়াইকরণ পর্যন্ত যে সকল রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহূত হয় তা সঠিক আছে কিনা তা যাচাই করতে হবে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ফসলে/ খামারে ব্যবহূত বালাইনাশক/ রাসায়নিককে প্রধান চারভাগে শ্রেণিবিন্যাস করেছে— ক) অতি উচ্চমাত্রার বিষক্রিয়াসম্পন্ন বালাইনাশক (শ্রেণি- ১এ)। খ) উচ্চমাত্রার বিষক্রিয়াসম্পন্ন বালাইনাশক (শ্রেণি- ১বি)। গ) মাঝারি মাত্রার বিষক্রিয়াসম্পন্ন বালাইনাশক (শ্রেণি- ২)। ঘ) সামান্য মাত্রার বিষক্রিয়াসম্পন্ন বালাইনাশক (শ্রেণি- ৩)।

রাসায়নিক সার ও প্লান্ট গ্রোথ রেগুলেট (পিজিআর)- এর টক্সিসিটি - বিষক্রিয়া উল্লেখিত চারটি গ্রুপের চেয়ে অনেক গুণ কম ও নিরাপদ। আমাদের দেশে উল্লেখিত চারটি গ্রুপের কীটনাশক আমদানি সরকারি অনুমোদন থাকার কারণে আমাদের খাদ্যে বিষক্রিয়ায় রেসিভিউ থাকার সুযোগ আছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে সকল ঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশক মাটিতে, পানিতে, বাতাসে, ফসলে, গুদামে শিল্পের কাঁচামালের নিমিত্তে নেওয়ার সময়/ পূর্ব/ পরে ব্যবহূত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ব্যবহারকারী কৃষককে দায়ী করা যায় না। বাজারে যা সরবরাহ করা আছে তা বৈধ বলেই কৃষক তার ফসল সব সময়  ব্যবহার করছে।

২. শস্য/ মত্স্য/ প্রাণী সম্পদ মজুদকালীন সময়ের ত্রুটি চিহ্নিতকরণ: খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াজাত করার পূর্বেও এগুলো সংরক্ষণের জন্য উচ্চমাত্রার বিষক্রিয়া বালাইনাশক/ প্রিজারভেটিভ দেওয়া থাকে। তাই আমদানি অনুমোদনের সময় মজুদকালীন সময়ে ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিকসমূহ নির্দিষ্টকরণ করতে হবে। সংরক্ষণ নীতিমালা প্রণয়ন করে তা কার্যকরি করতে হবে।

৩. শিল্পে/ প্রক্রিয়াজাত খাবারে/ হোটেল রেষ্টুরেন্ট-এর ত্রুটিসমূহ শনাক্তকরণ: খাদ্য অনিরাপদ হবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সর্বশেষ ধাপ এটি। শিল্প/ কলকারখানায় খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষেত্রে উত্পাদিত পণ্যেও মাননিয়ন্ত্রণের যন্ত্রপাতি ও ল্যাব সুবিধা থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ থেকে পানিতে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম ও সীসা পানিতে এবং বাতাসে ছড়াচ্ছে। সেটা আমাদের ফুড চেইনে ঢুকে যাচ্ছে।

তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন এজেন্ডা হবে নিরাপদ পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা ও আগামী প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সেইজন্য অতিমাত্রায় বিষাক্ত বালাইনাশক আমদানি অনুমোদন অনতি বিলম্বে স্থগিত করে নিরাপদ বালাইনাশক স্থানীয়ভাবে উত্পাদনে সরকারকে বিশেষ সুবিধা দিতে হবে। আমরা যদি স্থানীয়ভাবে বালাইনাশক উত্পাদনে সামর্থ্য হই তাহলে এর মাননিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। বেসরকারি পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণের ল্যাব স্থাপনের নীতিমালা ও অনুমোদন সহজ করে দিতে হবে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যবসায়ীর মান নিয়ন্ত্রণ মানদণ্ড বজায় রাখার জন্য সরকারি-বেসরকারি ল্যাব থেকে নির্দিষ্ট সময় পরপর মাননিয়ন্ত্রণ সার্টিফিকেট সংরক্ষণ করবে। সরকারের বর্তমান ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে প্রশংসিত হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদী সুফল নিতে হলে সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে নিরাপদ খাদ্যের সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিলে দেশ রক্ষা পাবে।