হাছন রাজার একটি গানের প্রথম ছত্র এইরকম—‘লোকে বলে বলে রে ঘর-বাড়ি ভালা নাই আমার / কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার।’ বিশ্বের প্রতি ১০৮ জনে একজন মানুষ শূন্যের মাঝারে জীবন কাটাইতেছে। ভালো হউক খারাপ হউক—কোনো ঘরবাড়িই নাই তাহাদের। বিশ্বব্যাপী এই ঘরছাড়া মানুষের সংখ্যা ৭ কোটি ছাড়াইয়া গিয়াছে। জাতিসংঘের শরণার্থীসংক্রান্ত শাখা (ইউএনএইচসিআর) সম্প্রতি প্রকাশ করিয়াছে এই রিপোর্ট। এই ৭ কোটি ৮ লক্ষ ঘরছাড়াদের মধ্যে রহিয়াছে ২ কোটি ৫৯ লক্ষ শরণার্থী। ৪ কোটি ১৩ লক্ষ মানুষ নিজেদের দেশেরই অন্যত্র ঠাঁই লইয়াছেন। অন্যদিকে ৩৫ লক্ষ মানুষ আশ্রয়প্রার্থী হইয়াছেন ভিনদেশে। আর এই শরণার্থী সংখ্যার অর্ধেকই শিশু।
পরিসংখ্যানে ইহা স্পষ্ট যে, ঘরছাড়াদের সংখ্যায় রেকর্ড বৃদ্ধি হইয়াছে। ২০০৯ সালে যে সংখ্যাটি ছিল ৪ কোটি ৩৩ লক্ষ, তাহা দশ বত্সরে সাত কোটি পার করিয়াছে। ঘরছাড়া এই মানুষগুলি কবে ঘরে ফিরিতে পারিবেন—তাহা কেহ জানেন না। এইক্ষেত্রে সিরিয়ার কথাই ধরা যাক। যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো অভিজ্ঞতাই নাই সিরিয়ার লক্ষ লক্ষ শিশুর। ২০১১ সাল হইতে সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধের ফলে দেশটিতে সৃষ্টি হইয়াছে এমন একটি প্রজন্ম, যাহারা প্রচণ্ড মানসিক চাপ তথা টক্সিক স্ট্রেসের ভেতর দিয়া দিনাতিপাত করিতেছে। কিন্তু কেন এই দুর্বিষহ নারকীয় জীবন বরণ করিতে হইতেছে তাহাদের? সিরিয়া, লিবিয়া বা ইরাকের মতো দেশে হয়তো পশ্চিমাদের আদলে গণতন্ত্র ছিল না, কিন্তু কথিত বসন্ত আসিয়া ফুল ফুটাইবার পরিবর্তে যেইভাবে গৃহদাহ সৃষ্টি করিল—তাহার দায় এড়াইবার সুযোগ কোথায়? বরং একটি সমৃদ্ধ দেশ আবহমানকাল ধরিয়া যেইভাবে থাকিতে অভ্যস্ত, তাহাকে তাহার নিজস্ব সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য লইয়াই থাকিতে দেওয়াটা ছিল যথার্থ। কিন্তু ২০০১ সালের এগারোই সেপ্টেম্বর বিশ্বকে নূতন করিয়া পালটাইয়া দিয়াছে। টুইন-টাওয়ারের ভয়াবহ হামলার পর মার্কিন মিত্রজোট সন্ত্রাসনির্মূলে বিশ্বব্যাপী শুরু করে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ যুদ্ধ। কথিত এই ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ যুদ্ধে সরাসরি প্রাণ হারাইয়াছে পঞ্চাশ লক্ষাধিক মানুষ। আর এই যুদ্ধ ছড়াইয়া পড়িয়াছে বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশে। ইহার সহিত যুক্ত হইয়াছে বাণিজ্যের পরিধি বৃদ্ধি, ক্ষমতার আগ্রাসন এবং বিচিত্র লভালাভের যোগফল। এই সকল ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই নাই। বরং নিজেদের প্রয়োজনে পরাশক্তিরা এই সকল যুদ্ধের মধ্যে কোনো একটি ‘আদর্শের’ প্রলেপ দিয়া থাকে। এই যে যুদ্ধকে আদর্শের প্রলেপ দিয়া আরো আগ্রাসী এবং অনিবার্য করিয়া তোলা হয়—মানবসভ্যতার সবচাইতে কলঙ্কিত ধ্যানধারণা লুকাইয়া আছে ইহার ভিতরেই।
মনে রাখিতে হইবে, এই বিশ্ব দানবের তরে নহে, মানবের তরে। সুতরাং পরাশক্তিদের মধ্যে এখন এই আত্মোপলব্ধি জাগ্রত হওয়া জরুরি যে, কোথাও তীব্র সংকট তৈরি করিয়া চিরকাল আখের গোছানো যায় না। সেই সংকটের প্রতিক্রিয়ায় পালটা সংকট ঘনীভূত হইতে পারে তাহাদের দেশেও। সুতরাং তাহারা নিজেরা ভালো থাকুক, অন্যদেরও শান্তিতে থাকিতে দিক।
