আমাদের দেশটা বড়ই আজব। এদেশে অনেকেই আছেন যাঁরা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাটা গোপন করতে পছন্দ করেন। অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা তাদের গরিবি ঢাকতে চান। অনেকে আবার গরিব সাজতে পছন্দ করেন। এতে করে অনেক ঝামেলা থেকেও রেহাই পাওয়া যায়। চাঁদাবাজ-সাহায্যপ্রার্থীদের হাত থেকে বাঁচা যায়। এমনকি চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারীদের কোপানলে পড়ার ভয়ও কম থাকে। গরিব হওয়ার গরিব থাকার সুবিধা একেবারে কম নয়!
তবে আমাদের দেশের বড়লোকরা কেউই তাঁদের আসল পরিচয়টা দিতে চান না। তাঁরা মাসে কয়েকবার ইউরোপ-আমেরিকা যান। দেশে কোটি টাকার দামের গাড়ি ব্যবহার করেন। কিন্তু যখনই তাঁদের সহায়-সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়, তখনই তাঁরা ‘নিঃস্ব’ হয়ে যান। আমাদের দেশে কোনো কোনো ধনী ‘গুপ্তঘাতকের’ মতো ‘গুপ্তধনী’। নিজের ধনদৌলতের কথা অনেকেই প্রকাশ্যে বলতে সাহস পান না। নিজের বড়লোকত্ব ঢাকাতে তাঁদের চেষ্টার কোনো শেষ নেই। আগেকার দিনে মানুষ চোর-ডাকাতের ভয়ে নিজেরা ধনী হলেও সে তথ্য বড় বেশি প্রকাশ করত না। যদিও তাদের বাড়িঘর-চলাফেরা, আচরণ দেখে ঠিকই বোঝা যেত যে তারা ধনবান।
এখনকার ধনীরাও স্রেফ কর দেবার ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখেন। কর আইনের ফাঁক গলিয়ে কীভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখা যায়, ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া যায়—এই জন্য তারা সাধ্যসাধনা করে যান। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবেই আমাদের দেশে এখন ৭৫ হাজার কোটিপতি আমানতকারী আছেন। অথচ বড় করদাতা হিসেবে তাঁদের বেশিরভাগেরই নাম নেই। আমাদের দেশের বড়লোকরা আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন বেশি। কেউ যেন তাঁদের বড়লোক না বলে সেজন্য তাঁদের চেষ্টার কোনো অন্ত নেই। কিন্তু পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে ভিন্ন চিত্র। বড়লোকরা তাদের ধনসম্পদের তথ্য গোপন করার কোনো চেষ্টা করেন না। পৃথিবীতে বহু সংস্থা আছে, যারা নিয়মিতভাবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনীদের তালিকা প্রকাশ করে থাকে। বছর জুড়ে শীর্ষ ধনীদের নানা ধরনের খবর প্রকাশিত হয়। তাঁদের শখ, তাঁদের দান, সম্পদ ওঠানামাসহ নানা ধরনের তথ্য আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে পড়ি ও দেখি। ঐসব ধনী ব্যক্তিরা তাঁদের সম্পদের তথ্য লুকানোর চেষ্টা না করে নিজেরাই প্রকাশ করেন। যাঁরা বিভিন্ন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মালিক, তাঁদের সম্পদের তথ্য পাওয়া আরও সহজ। খুব সহজে জানা যায় সম্পদ বৃদ্ধি বা হ্রাসের তথ্যও। ফোর্বস বা ব্লুমবার্গ-এর মতো সংবাদমাধ্যম সারা বছর ধনীদের নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা করে। এই তো ১৭ মার্চ ফোর্বস বিশাল আয়োজন করে ২০১৯ সালের শীর্ষ ধনীর তালিকা প্রকাশ করেছে। এসব তালিকায় নাম ওঠা নিশ্চয়ই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ ধনীদের জন্য বিশেষ কিছু। মর্যাদা বাড়ায় এই তালিকা।
কিন্তু আমাদের মতো ‘গুপ্তধনী’র দেশে শীর্ষ ধনী কে বা কারা, কত তাঁদের সম্পদ-এ তথ্য পাওয়া যায় না। এখানে যাঁদের অনেক সম্পদ, তাঁরা কেউই তার হিসাব দিতে আগ্রহী হন না। সম্পদের উত্স নিয়ে প্রশ্ন থাকে বলেই এই লুকোচুরি। তাদের সম্পদের তথ্য জানার একমাত্র উপায় হতে পারত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দেওয়া সম্পদের হিসাব। কিন্তু সমস্যা এখানেও আছে। এমনও দেখা গেছে, একই ব্যক্তি কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য এনবিআরকে দিয়েছেন কম সম্পদের হিসাব, আর ব্যাংকঋণ পেতে দিয়েছেন বেশি সম্পদের তথ্য। শীর্ষ ধনী যাঁরা, তাঁরা সব ধরনের কর দেওয়ার পরেই শীর্ষ ধনী। বাংলাদেশে উল্টো।
বাংলাদেশের শীর্ষ করদাতা একজন জর্দা ব্যবসায়ী। বছরে ৬ কোটি টাকা কর দেওয়ার কথা সেই জর্দা ব্যবসায়ী নিজেই জানিয়েছেন। এ হিসাবে তাঁর আয় ও সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার ধারেকাছেও থাকার কথা নয়। কিন্তু তাঁর চেয়েও যাঁরা অনেক বেশি ধনী ১০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ যাঁদের, তাঁদের তথ্য আমাদের কাছে নেই। না এনবিআরের কাছে আছে, না বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। দেশে প্রকৃত ধনীরা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টাকা না দিলে কী হবে, আমাদের জাতীয় বাজেটের আকার কিন্তু দিন দিন বাড়ছেই। ‘গুপ্তধনী’দের বাদ দিয়ে দেশে তামাকজাতপণ্য উত্পাদনকারী ও ব্যবহারকারীদের নিশানা করে সরকার বিশাল আকৃতির নতুন বাজেট ঘোষণা করেছে। ১৯৭২-৭৩ সালে দেশের প্রথম বাজেট তাজউদ্দীন আহমদ পেশ করেছিলেন ৭৮৬ কোটি টাকা। আর এবারের বাজেটের আকার ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার।
অবশ্য অনেকের কাছে এই সোয়া পাঁচ লাখ হাজার কোটি টাকাকে সামান্য টাকাও মনে হতে পারে। এ ব্যাপারে একটি প্রচলিত কৌতুক শোনা যাক। একজন গরিব মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের কথা হচ্ছে। গরিব মানুষটি বললেন : প্রভু, আপনার কাছে এক লক্ষ বছর কীসের সমান?
ঈশ্বর : এক মিনিটের মতো, বত্স।
গরিব মানুষ : আর, এক হাজার কোটি টাকা?
ঈশ্বর : এক টাকার সমান।
গরিব মানুষ : আমাকে একটা টাকা দেবেন?
ঈশ্বর : এক মিনিট অপেক্ষা করো!
২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বিড়ি ও সিগারেটের ওপর উচ্চহারে করারোপ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ধূমপানবিরোধী রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান, তামাকজাত পণ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকায় এর ব্যবহার কমানো এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে এ করারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এবারের বাজেটে নিম্নতম স্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৭ টাকা। সেখানে সম্পূরক শুল্ক ধরা হয়েছে ৫৫ শতাংশ। মধ্যম স্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের মূল্য হবে ৬৩ টাকা এবং সম্পূরক শুল্ক হবে ৬৫ শতাংশ। উচ্চ স্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের মূল্য হবে ৯৩ টাকা ও ১২৩ টাকা। এখানে সম্পূরক শুল্ক হবে ৬৫ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের বাজেট অনুযায়ী নিম্নতম স্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের দাম ৩৫ টাকা ও সম্পূরক শুল্ক ৫৫ শতাংশ। মধ্যম স্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের মূল্য ৪৮ টাকা এবং সম্পূরক শুল্ক ৬৫ শতাংশ। উচ্চ স্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের দাম ৭৫ ও ১০৫ টাকা। এখানে সম্পূরক শুল্ক ৬৫ শতাংশ।
অন্যদিকে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিড়ি-সিগারেটের মতো ভয়াবহ আরেকটি পণ্য হলো জর্দা ও গুল। তাই এর ব্যবহার কমানোর জন্য প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার দাম ৩০ টাকা ও প্রতি ১০ গ্রাম গুলের দাম ১৫ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি দুটোরই সম্পূরক শুল্ক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
তামাক ও তামাকজাত পণ্যের ওপর এই করারোপের প্রস্তাবে যথারীতি ক্ষুব্ধ হয়েছেন এসব পণ্যের ব্যবহারকারীরা। তাঁরা নিয়মিত কর পরিশোধকারী হিসেবে নিজেদের ‘দেশপ্রেমিক’ হিসেবেও দাবি করছেন। একজন তো বিশ্লেষণ করিয়ে দেখিয়ে বলছেন, ‘যে দিনে ৫০ টাকার সিগারেট খায় সে দিনে মোট ট্যাক্স ৩০ টাকা, মাসে ৯০০ টাকা, বছরে ১০ হাজার ৮০০ টাকা। কতিপয় উচ্চ আয়ের মানুষ বছরে ৩ হাজার টাকা ট্যাক্স দিয়ে TIN (Taxpayer Identification Number) পেয়ে থাকে আর অবহেলিত ধূমপায়ীরা ১০ হাজার ৮০০ টাকা ট্যাক্স দেওয়ার পরও TIN নাম্বার পায় না!
অনতিবিলম্বে ধূমপায়ীদের TIN নাম্বার দেওয়ার দাবি জানাই। তামাক বাবদ ৪৫ শতাংশ আর ভ্যাট ১৫ শতাংশ অর্থাত্ মোট ৬০ শতাংশ কর দিতে হয় সিগারেট বাবদ।
এই হিসেবে ১০০ টাকার সিগারেট খেলে সরকারকে দিতে হয় ৬০ টাকা। লাখ লাখ যুবক সিগারেট খেয়ে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এই অবদানের বিপরীতে ধূমপায়ীরা পায় অবজ্ঞা। সবাই খারাপ চোখে দেখে। উফ কী গন্ধ! যা দূরে যা! বাবা-মায়ের বকা এমনকি মারধর পর্যন্ত। এই হিসেবে ২ বছরের ধূমপায়ীদের অবদানের মাধ্যমে একটি পদ্মা সেতু বানানো সম্ভব।
তাই প্রত্যেক ধূমপায়ীই একজন নীরব দেশপ্রেমিক!
প্রশ্ন হলো, সরকার কি কেবল এই ‘নীরব দেশপ্রেমিক’দের ওপরই খড়্গহস্ত হবে? আর ‘কৌশলী’ বা ‘গুপ্ত’ ধনীরা বরাবরের মতো এবারও পার পেয়ে যাবে?
n লেখক : রম্যরচয়িতা
