‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা’

আপডেট : ২১ জুন ২০১৯, ২১:২২

ফাদার গৌরব জি. পাথাং, সিএসসি

 

‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা’ চট্টগ্রামের এই আঞ্চলিক গানটি এখন মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। বর্তমান বাজারে খাদ্য, ওষুধ ও বিভিন্ন পণ্যের যে অবস্থা, তা দেখে আমার মধ্যেও এই কথাটিই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বাইরের রূপ দেখতে চকচক, লোভনীয়, আকর্ষণীয় কিন্তু ভেতরে বিষ। বিক্রেতারা বিভিন্ন কৌশলে আমাদের বিষ খাওয়াচ্ছে। কাঁচা কাঁঠাল ঘাই দিয়ে পাকানো হয়। ঘাঁই মানে হলো পেরেক জাতীয় কিছু একটা দিয়ে বোঁটার দিক ফুটো করে বিষ বা কেমিক্যাল দিয়ে পাকানোর পদ্ধতি। কলা পাকানো হয় রাইপেন-ইথোফেন বা কার্বাইড স্প্রে করে। সিরিঞ্জ দিয়ে তরমুজের ভেতর রং ভরে লাল করা হয় এবং ওজন বাড়ানো হয়। মাছে ফরমালিন দিয়ে তাজা দেখানো হচ্ছে, মাংসে রং মিশিয়ে কিংবা রক্ত মিশিয়ে তাজা দেখানো হচ্ছে।

সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের কিছু শিরোনাম—‘রাজধানীতে ৮০ ভাগ হোটেলে খাওয়ানো হয় মরা মুরগী’, ‘কাপড়ের রং আর স্যাকারিন দিয়ে তৈরি ম্যাংগো জুস’, ‘চট্টগ্রামে রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে নকল ‘ট্যাং’ তৈরি’, ‘বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দুধ পান করা হয় বাংলাদেশে’, ‘নোয়াখালীতে শেয়ালের মাংস, ঢাকায় গরু মাংসে বিষাক্ত কেমিক্যাল রং’, ‘বার্নিশ কালার, চক পাউডার, ফিটকিরি, চিনি, ময়দা ও রং দিয়ে আখের গুড় তৈরি’,  ‘মেয়াদোত্তীর্ণ মাংস রক্ত মিশিয়ে বিক্রি’, ‘কলা পাকাতে ভয়ানক কেমিক্যাল, ক্ষতিগ্রস্ত কিডনি-লিভার’, ‘বিষাক্ত রাসায়নিকে কাঁচা আম পাকা, ধরলেন ম্যাজিস্ট্রেট’, ‘আড়তে বিক্রি হয় ফরমালিনযুক্ত আম’।

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে খাবারে ভেজালের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। বিক্রেতারা অধিক মুনাফা লাভের আশায় খাদ্যে রাসায়নিক কেমিক্যাল, রং, ফরমালিন  মেশানোসহ নানা অসদোপায় অবলম্বন করে থাকে। দুর্নীতি, ঘুষ ও আইনের ফাঁকফোকরের কারণে এসব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই আমরা নিম্নমানের খাদ্যপণ্য গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছি। নামি-দামি ব্যান্ডের  তেল, ঘি, সেমাই, নুডলস, মসলা, আটা, পানি, জুস, চাল প্রভৃতি নিম্নমানের খাদ্যপণ্যও গ্রহণ করছি। জীবনরক্ষাকারী ওষুধও নকল করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধেও বাজার সয়লাব। যে ওষুধ জীবন রক্ষা করার কথা, সেই ওষুধকেই এখন আমাদের প্রথমে রক্ষা করতে হবে। নইলে আমরা রক্ষা পাব না।

বিএসটিআইয়ের ল্যাব পরীক্ষায় ৫২টি নিম্নমানের খাদ্যপণ্য ধরা পড়েছে। হাইকোর্ট সে সব পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, সেইসব পণ্য প্রত্যাহার করাই কি সমাধান? সেইসব পণ্য যে আবার আসবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? বরং সেইসব পণ্য প্রত্যাহারসহ কারখানা বন্ধ করতে হবে কিংবা লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। শুধু তাই নয় এ অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। ভেজাল খাবার, বিষযুক্ত খাবার, ফরমালিনযুক্ত খাবার দেশ থেকে মুক্ত করতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যত্ অন্ধকার। শিশুরা স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে না, খুব সহজেই রোগে আক্রান্ত হবে, অল্প বয়সেই মারা যাবে, জটিল রোগের উদ্ভব হবে।

ঢাকা