কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে রাজস্ব পদে চাকরির নিয়োগপত্র পান তারা। যোগদানও করেন, তোলেন বেতন-ভাতাও। কিন্তু কয়েক মাস পর নিয়োগের সেই আদেশ বাতিল করে সংস্থাটি। ভুক্তভোগীরা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে আবেদন করলে নিয়োগ বাতিলের আদেশটির ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। তবে পরে আর যোগদান করতে পারেননি তারা।
প্রশ্ন উঠেছে—নিয়োগই কেন দিল, আবার আদেশও কেন বাতিল করল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদালতের একটি রায়ের তথ্য গোপন করে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি জানার পর নিয়োগ আদেশ বাতিল করা হয়েছে। যারা এ কাজে জড়িত, তাদের এক জনকে ঢাকায় সংযুক্ত রেখে বদলি করা হয়। আর এর নেপথ্যের হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
তথ্য অনুযায়ী, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘বৃহত্তর সিলেট জেলায় কমলা ও আনারস উন্নয়নসহ সমন্বিত কৃষি উদ্ভাবন উন্নয়ন’ শীর্ষ প্রকল্পটি ২০০০ সালের ১ জুলাই শুরু হয়ে ২০০৮ সালের ৩০ জুন শেষ হয়। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ২৪ জন কর্মচারী রাজস্ব খাতে আসার জন্য আদালতে রিট করেন। দীর্ঘদিন এই মামলা উচ্চ আদালতে চলমান থাকে। সুপ্রিম কোর্টের আদেশের পর তা আইন ও বিচার বিভাগের মতামতের আলোকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে (ডিএই) চিঠি দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়।
গত বছরের ২৬ জানুয়ারি কৃষি মন্ত্রণালয়ের তত্কালীন সম্প্রসারণ-২ অধিশাখার উপসচিব (বর্তমানে কৃষিমন্ত্রীর পিএস) মোহাম্মদ রাজীব সিদ্দিকী ডিএইর তত্কালীন মহাপরিচালক বেনজীর আলমকে চিঠি দিয়ে মামলার বিস্তারিত জানান। চিঠিতে বলা হয়, ‘বৃহত্তর সিলেট জেলায় কমলা ও আনারসের উন্নয়নসহ সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন’ শীর্ষক সমাপ্ত প্রকল্পের ২৪ জন কর্মচারীর চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সুযোগ নেই। কিন্তু কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা উচ্চ আদালতের রায় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে কয়েক ধাপে ১৭ জনকে নিয়োগ দেন।
কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন আদেশ সূত্রে জানা যায়, ২৪ জন কর্মচারীর চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সুযোগ নেই—এমন নির্দেশনা জারির প্রায় সাড়ে ছয় মাস পর গত বছরের ১২ জুলাই ঐ প্রকল্পের সাত জনকে আপিল বিভাগের রায়ের কথা উল্লেখ করে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর আলাদা আলাদা স্মারকে দুই জন, সাত জন ও এক জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের সব কাগজপত্র তৈরি করেন প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের লিগ্যাল অ্যান্ড সাপোর্ট সার্ভিসেস (লিসাসা) বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা (মূল পদ প্রধান সহকারী) আব্দুল হান্নান। মূল ভূমিকায় ছিলেন উপপরিচালক (লিসাসা) শহিদুল ইসলাম। প্রতিটি নিয়োগ আদেশেই স্বাক্ষর করেন তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজীর আলম, যিনি বর্তমানে অবসরোত্তর ছুটিতে রয়েছেন।
প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে নিয়োগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা চাকরিতেও যোগদান করেন। কয়েক মাস বেতন-ভাতাও পান। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই উচ্চ আদালতের রায়টি সামনে চলে আসে। এতে তাদের নিয়োগ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। বিষয়টি গড়ায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পর্যন্ত। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কৃষি মন্ত্রণালয়কে জানায়, ঐ প্রকল্পের জনবল রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরের সুযোগ নেই। তবে সমাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্পের জনবল উন্নয়ন প্রকল্পের যেসব পদ রাজস্ব বাজেটে নতুনভাবে সৃজিত হয়েছে, সেই সব পদে আবেদনের ক্ষেত্রে বয়সসীমা শিথিলের সুযোগ পেতে পারে।
এই নিয়োগ নিয়ে নানা জটিলতা তৈরির পরিপ্রেক্ষিতে বাধ্য হয়ে একে একে সব নিয়োগ আদেশ বাতিল করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তৎকালীন ডিজি বেনজীর আলম। নিয়োগ আদেশে আদালতের রায়ের কথা যেমন উল্লেখ করা হয়, তেমনি আদালতের রায়ের কথা উল্লেখ করেই তা বাতিল করা হয়। বাতিল আদেশে তিনি বলেন, মামলার রায় পর্যালোচনায় আইনগত জটিলতা পরিলক্ষিত হওয়ায় নিয়োগের জন্য জারিকৃত অফিস আদেশ বাতিল করা হলো।
নিয়োগ বাতিলের পর সাত জন কর্মচারী চাকরি ফিরে পেতে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করেন। বর্তমানে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল নিয়োগ বাতিলের আদেশে স্থগিতাদেশ (স্টে) দিয়েছে।
নিয়োগ বাতিল হওয়া কর্মচারী আজিজুর রহমান বলেন, নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরে তা বাতিল করা হয়। এ বিষয়ে এখন খুব একটা খোঁজখবর জানি না। হারিচুর রহমান নামে একজন কর্মচারী বলেন, ‘যোগদানও করেছিলাম। কেউ কেউ বেতনও তুলতে পেরেছিল। কিন্তু এর পরই নিয়োগ বাতিল করা হয়। এখন প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের আলোকে আমাদের যোগদানের কথা, কিন্তু তা-ও দিচ্ছে না।’
এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মশিউর রহমান জানান, তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে। এর বাইরে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।
এদিকে গত সপ্তাহে এই নিয়োগ ও বদলিসংক্রান্ত জেরে অধিদপ্তরের কয়েক জন কর্মচারীর মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সংস্থাটির উপপরিচালককে দায়ী করে মহাপরিচালককে চিঠি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আহত কর্মচারীরা শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার অনুমতি চেয়েছে সংস্থাটির প্রধানের কাছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শহীদুল ইসলাম নিয়োগে অন্যতম ভূমিকা রেখেছেন। অথচ এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অধিদপ্তর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এসব বিষয়ে জানতে উপপরিচালক শহীদুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। আর সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আলমের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। এদিকে মোবাইল ফোনে এসএমএস দিলেও সাড়া দেননি বর্তমান মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস।
