সবাই যখন ঈদ আনন্দে মাতোয়ারা, তখন গাজীপুরের বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে অনেকের সময় কাটছে চোখের জলে। পরিবারের জন্য জীবনভর সবটুকু দিয়েও শেষ জীবনে এসে নিঃসঙ্গ তারা। বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মানুষগুলো অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, নতুন পোশাক আর বিশেষ খাবার পেলেও উত্সব ছুঁয়ে যায় না তাদের। স্বজনহীন বৃদ্ধাশ্রমে কৃষ্ণচূড়ার রংও যেন বিবর্ণ। সুখের গল্প কেবলই অতীত। জীবনভর নিজ পরিবারের জন্য সর্বস্বটুকু দিয়ে যাওয়া প্রবীণরাই আজ একা, নিঃসঙ্গ। শেষ বয়সে, যাদের পাওয়ার কথা একটু আদর, সন্তানদের ভালোবাসার পরশ, তাদের ভাগ্যেই এমন নির্মম পরিহাস।
গাজীপুর সদর উপজেলার বিশিয়া কুড়িবাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা এ বৃদ্ধাশ্রমে ১৬০ জন নারী-পুরুষ রয়েছেন। এর মধ্যে মহিলা ৭৫ জন, পুরুষ ৮৫ জন। তাদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে কাজ করেন ১৬ জন সেবিকা। গাজীপুর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটির প্রতিষ্ঠাতা খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল। প্রতি সপ্তাহে তিনি এখানে এসে সবার খোঁজখবর নেন। সম্পূর্ণ সবুজে ঘেরা এই পুনর্বাসন কেন্দ্রটি ১০০ বিঘা জমির ওপরে প্রতিষ্ঠিত। মসজিদ আছে, বয়স্করা মসজিদে নামাজ আদায় করেন। বিশাল লেক আছে, সেখানে মাছ চাষ করা হয়। আছে বিনোদনকেন্দ্রও। বয়স্কদের মানসিক প্রশান্তি দেওয়ার সব কিছুই আছে সেখানে। কিন্তু সেখানে বসবাসকারীদের কিছুতেই যেন মনের তৃপ্তি পূর্ণ হয় না। প্রায় ৫০ জন বয়স্ক বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা হয় ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি। অধিকাংশই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, একদিনের জন্যও সন্তান ছাড়া থাকতে পারতাম না। সেই ছেলেমেয়েরা এখন একবারের জন্য দেখতেও আসে না। তাদের ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। তবে এই বৃদ্ধাশ্রমে তারা অনেক ভালো আছেন।
স্বামী হারিয়ে দুই সন্তানকে অনেক সংগ্রাম করে মানুষ করেছেন একজন স্কুলশিক্ষিকা মা। পারিবারিক নানা জটিলতায় এখন ঠাঁই হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। ঈদে নতুন জামা, বিশেষ খাবার পেলেও তার মনে শান্তি নেই। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে আমার ছেলেটা ঈদের আগের দিন কত বায়না করত। ওরে পটকা কেনার টাকা দিতে হইব। শার্ট, গেঞ্জি পছন্দ না হলে বারবার পালটাইতে হইবা। ওর বাপ একটু বেশি রাগি ছিল। তাই ভয়ে সব কিছু আমারেই কইত। ওর (ছেলের) বাপ রে লুকাইয়া, ওরে যে (ছেলেকে) কত টেকা দিছি। এখন তো ওরই অনেক টেকা।’ কথাগুলো বলতে বলতেই কেঁদে ফেললেন ঐ মা। ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার একটি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তিনি। ঈদের সময়ের স্মৃতিগুলো মনে করে ৭০ বছর বয়সি এই নারী বারবার তার মুখে কাপড় দিয়ে চোখ মোছার চেষ্টা করছিলেন। বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে হয়তোবা এখন অনেক কিছু মনে পড়ে না তার। অথবা কিছু মনে করতেও চান না তিনি।
শুধু এই মা নয়, গাজীপুরের বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা ৭৫ জন মা আর ৮৫ জন বাবা জানেন ঈদ মানে আনন্দ। কিন্তু অন্যদের মতো ঈদের আনন্দ নেই তাদের মনে। নেই কোনো আপনজনের অপেক্ষা। কারণ তারা জানেন কোনো আপনজনই তাদের আর খোঁজ নেবে না। একসময় স্বামী, স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা এবং পরিবার সবই ছিল তাদের। কিন্তু ভাগ্যের কষাঘাতে তারা এখন বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা। আপনজন থেকেও নেই তাদের। সন্তানরা তাদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকের সন্তানের বিদেশে ও ঢাকায় বাড়ি-গাড়ি রয়েছে। কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মাকে ঘরে থাকতে দেননি। কিন্তু আপনজনহীন মা-বাবাদের আপন করে নিয়েছে ‘বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র’ নামের একটি বৃদ্ধাশ্রম। রাস্তায় পড়ে থাকা অসুস্থ মায়েদের তুলে এনেছেন তারা। করছেন সেবা-যত্ন, ব্যবস্থা করেছেন চিকিত্সার এবং থাকা খাওয়ার। ডাক্তার আছেন, সেখানে ২৪ ঘণ্টা চিকিত্সাসেবার ব্যবস্থা রয়েছে। করোনার সময়ও লকডাউনে রেখেও চিকিত্সাসেবা দেওয়া হয়েছে। অনেকে একবার এলে আর এখান থেকে যেতে চান না। কেউ কেউ বৃদ্ধ হয়ে এই বৃদ্ধাশ্রমেই মারা গেছেন। মৃত্যুর পরেও এই মা-বাবাদের দাফনের ব্যবস্থা করে এ বৃদ্ধাশ্রম।
গিভেন্সি গ্রুপের মালিক খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুলের তত্ত্বাবধানে ১৯৯৫ সালের ২১ এপ্রিল বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। ঐ বছর নোবেল বিজয়ী মানবতার দূত মাদার তেরেসা এসেছিলেন। অসহায় মানুষের জন্য অভূতপূর্ব বৃদ্ধাশ্রম দেখে তিনি মুগ্ধ হন। প্রতিষ্ঠাতাকে তিনি অভিনন্দন জানান। এখানে সব ধর্মের মানুষ রয়েছেন। মুসলমানরা মারা গেলে কবরস্থান রয়েছে। খ্রিষ্টানদের জন্য আলাদা কবরস্থান ও হিন্দুদের জন্য সত্কারের ব্যবস্থা রয়েছে।
বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের সুপার মাহমুদা আক্তার বলেন, সন্তানের সুখবঞ্চিত মায়ের অভাব কারো পক্ষেই পূরণ করা সম্ভব না। তারপরও দুঃখ ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয় এখানে। নেওয়া হয় নিবাসীদের যত্ন, সেবার ব্যবস্থা। পুনর্বাসন কেন্দ্রের চিকিত্সক বিল্লাল হোসেন বলেন, নিবাসীদের সবার জন্য আমৃত্যু খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও বিনোদনের সংস্থান করা হচ্ছে কেন্দ্রটিতে।
সমাজ বিজ্ঞানীরা বলেন, কী হবে অক্সফোর্ড থেকে পিএইচডি করে, কী হবে বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে, কী হবে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে অনেক বড় ডিগ্রি লাভ করে, মেডিক্যাল থেকে ডাক্তারের সার্টিফিকেট নিয়েও লাভ কী? যদি না হতে পারি মানুষের মতো মানুষ, মানবতার ছিটেফোঁটা যদি নাইবা থাকে মনে।
গাজীপুর পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল বলেন, অসহায় মা-বাবাদের জন্য আমার প্রতিষ্ঠান ও আমি আছি। আমার এখানে সারা দেশ থেকে যেখান থেকে বলবে, সেখান থেকে নিয়ে আসব। কোথাও জায়গা না থাকলেও আমার এখানে জায়গা আছে।
