পশ্চিমের জেলাগুলোর ওপর দিয়ে প্রবাহিত এক কালের খরস্রোতা নদনদীগুলো এখন ফসলের খেত। মানুষ সৃষ্ট কারণে এসব নদনদী এখন মৃত, একেকটি মরা খালে পরিণত হয়েছে। অথচ কোনো কোনো নদনদীতে একসময় লঞ্চ স্টিমার চলত।
এ অঞ্চলের নদনদীগুলোর পানির উৎস ছিল পদ্মার শাখা গড়াই ও মাথাভাঙ্গার মাধ্যমে। উৎসমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ার নদনদীগুলোর মৃত্যু হয়েছে। এ অঞ্চলের একটি অন্যতম নদী ছিল কালী। কুষ্টিয়ার শহরের ভাটিতে গড়াই থেকে উৎপত্তি হয়ে কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ঝিনাইদহ জেলার গাড়াগঞ্জে কুমারের সঙ্গে মিশেছে। ১৯৫৪ সালে জি কে প্রকল্প বাস্তবায়নকালে কালী নদীর উৎস মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই থেকে এ নদীর মৃত্যু ঘটেছে। শুরু হয় নদী দখল প্রক্রিয়া। অনেক স্থানে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ হচ্ছে। নদীর বুক জুড়ে এখন বোরো ধানের সমারোহ। নদীর চিহ্ন বলতে ধানখেতের মধ্য দিয়ে সরু নালা। একই অবস্থা ডাকুয়া নদীর। গড়াই থেকে উৎপত্তি হয়ে শৈলকূপা উপজেলার কুচুয়া গ্রামে কালী নদীতে মিশেছে। এর উৎস মুখও বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন থেকে নদীটির মৃত্যু ঘটে। নদী এলাকার বিভিন্ন স্থানে বেদখল হয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে। নদীর বুকে চাষাবাদ হচ্ছে। এ অঞ্চলের অপর নদ কুমারের উৎপত্তি ছিল চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার হাটবোয়ালিয়ার কাছে মাথাভাঙ্গা থেকে। এ নদ চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভাটিতে মধুমতীর সঙ্গে মিশেছে। মানুষ সৃষ্ট কারণে ১৯৬০ সালের দিকে উৎস মুখ বন্ধ হয়ে যায়। কুমার নদ কালী ও ডাকুয়া নদী থেকে প্রবাহ পেত। এ দুটি নদী মরে যাওয়ায় পানির উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। এক সময় কুমার সাগরখালী চাঁপাইগাছি বিল হয়ে একটি প্রবাহ পেত। সে উত্সও আজ বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে নদীর বুকে পুকুর কেটে মাছ চাষ করছে প্রভাবশালীরা। বাড়িঘরও নির্মাণ করা হচ্ছে। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নদীর জমির মালিক হয়ে যাচ্ছে। আবার ভূমি অফিসের এক শ্রেণির কর্মকর্তা নদীর জায়গা ভূমিহীনদের মধ্যে বন্দোবস্ত দিয়েছে। তারা সেখানে বাড়িঘর তুলে বসবাস করছে। এতে কুমারের মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়েছে। এ অঞ্চলের অপর নদী নবগঙ্গার উৎপত্তি ছিল চুয়াডাঙ্গা জেলা মাথাভাঙ্গা থেকে। নদীটি চুয়াডাঙ্গা ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভাটিতে মধুমতী নদীতে মিশেছে।
প্রাকৃতিক ও মানুষ সৃষ্ট কারণে নবগঙ্গার উৎস মুখ ভরাট হয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে নদীটির মৃত্যু ঘটেছে। নদীর বুকে চাষাবাদ হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে দখলও চলছে। ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ফটকি নদীও আজ মৃত নদীর তালিকায়। নদীর বুকে চাষাবাদ হচ্ছে। চিত্রা নদীরও উৎপত্তি মাথাভাঙ্গা থেকে। নদীটি চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও নড়াইল জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভাটিতে রূপসায় মিশেছে। উজানে নদীটি মৃত। ভাটিতে জীবিত আছে। এ নদীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে পুকুর কেটে মাছের চাষ করছে প্রভাবশালীরা। চাষাবাদও হচ্ছে। ঝিনাইদহের বেগবতীর বেগ থেমে গেছে অনেক বছর আগে। নদীবক্ষ জুড়ে চাষাবাদ হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে দখলও চলছে। মাগুরা শ্রীপুরের হানু নদীর কোনো অস্তিত্ব নেই। একইভাবে হারিয়ে গেছে ঝিনাইদহের মহেশপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদী। মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও যশোর জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ভৈরব নদের ভৈরবী গর্জন বহু বছর আগেই থেমে গেছে। নদটিকে পুনঃখনন করে জীবিত করার চেষ্টা চলছে।
মৃত নদনদীগুলোর তীরবর্তী লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এসব নদনদীর যৌবন দেখেননি। কিন্তু যেটুকু জীবিত দেখেছেন, তা-ও নেই। নদনদীগুলো এখন বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টি বেশি হলে ভরে যায়। আবার যে বছর বৃষ্টি কম হয়, সে বছর পানি তলানিতে থাকে। কুমার-তীরবর্তী মনোহরপুর গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আবুল কালাম আজাদ জানান, তিনি কুমার, কালী ও ডাকুয়া নদের যৌবন দেখেছেন। কুমার নদে ইলিশ মাছ ধরা পড়ত, লঞ্চ চলত।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুষ্টিয়ার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল হামিদ জানান, এ অঞ্চলের জীবিত নদী গড়াইয়ের নাব্য ধরে রাখতে কয়েক বছর ধরে খনন চলছে। মাথাভাঙ্গা নদীর উৎস মুখ বিশাল চর জেগে শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এ নদীটি খননের জন্য প্রকল্প প্রণয়ন ও পর্যবেক্ষণ চলছে। কুমার, কালী, নবগঙ্গা ও চিত্রা নদনদী খননেরও পরিকল্পনা আছে বলে তিনি আরো জানান।
