মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা দখল করতে পারবে চীন?

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৩, ২২:৩৯

গত ৬ এপ্রিল সৌদি আরব ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সাত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বৈঠকে মিলিত হন। এক মাস আগে, দুই দেশের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলা শত্রুতার অবসান ঘটান। যার মধ্য দিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন হয়। ওমান ও ইরাকের কয়েক বছরের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পরে চীন এই মধ্যস্থতা করে দেয়। সৌদি-ইরান চুক্তিতে যে বিষোয়টি স্পষ্ট- মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের প্রভাব বাড়ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা কী দখল করতে পারবে চীন?

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এক বিশ্লেষণে বলছে, পাশ্চাত্যে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়ার অর্থনীতিকে সচল রাখতে চীনের কেন্দ্রীয় ভূমিকা এবং ইউক্রেন আক্রমণের বিষয়ে মস্কোকে প্রশ্ন করতে বেইজিংয়ের অনিচ্ছা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে চীনের নতুন সাফল্য, যা চীনের জন্য একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান-সৌদি আলোচনার কিছুদিন আগে বেইজিং গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ চালু করেছিল চীন। এর লক্ষ্য ছিল 'সংলাপ এবং পরামর্শের মাধ্যমে দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্য এবং বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা'। এরপর গত সপ্তাহে চীনের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাং বলেন, বেইজিং ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যেও শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত।

জার্মানির আর্নল্ড-বার্গস্ট্রেসার ইনস্টিটিউট ফ্রেইবার্গের সহযোগী ফেলো জুলিয়া গুরোল-হ্যালার বলেন, সৌদি-ইরান চুক্তি চীনের ভবিষ্যত নানা উদ্যোগের একটা মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি একটি ঘোষণা যে, নানা সংঘাতের মধ্যস্থতায় আগের চেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত চীন।

সংগৃহীত ছবি

অনেক বিশ্লেষকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে আসার সাথে সাথে চীনের এই প্রভাব বাড়ছে। ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত, সৌদি আরবের সঙ্গে উষ্ণ-উষ্ণ-শীতল সম্পর্ক এবং ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে দীর্ঘ দখলদারিত্ব-বিশৃঙ্খল অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনিদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত করেছে। পাশাপাশি 'বৈশ্বিক মোড়ল' হিসাবে দেশটির দশকের দীর্ঘ ভূমিকা সম্পর্কে তাদের জনগণের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যকে যা দিয়েছে, চীন কী তা দিতে পারবে? এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো না। তবে এখানে না বিষয় জড়িয়ে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে 'নিরাপত্তার জন্য' ওয়াশিংটনের এখনও কয়েক ডজন সামরিক ঘাঁটি এবং মিত্র দেশ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেইজিং হয়তো এখনও সামরিক বা নিরাপত্তাজনিত নানা বিষয়ে নাক গলাবে না। আপাতত চীন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে লাভবান হবে। যুক্তরাষ্ট্রও এই অঞ্চলের 'নিরাপত্তা উদ্বেগের' ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়া অব্যাহত রাখতে পারে।

সৌদি আরব-ইরান চুক্তির অনেক আগেই চীন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সৌদি ও ইরানের শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদার এখন চীন। দুই দেশ থেকে তেলের বৃহত্তম ক্রেতাও চীন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০২১ সালে ইরানের সঙ্গে ২৫ বছরের সহযোগিতা চুক্তি এবং ২০২২ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে চীনারা তাদের প্রভাবকে আরও দৃঢ় করেছে।

সংগৃহীত ছবি

তবে সৌদি আরব এবং ইরানের বাইরেও বিস্তৃত চীনা স্বার্থ। ২০১৩ সালে চালু হওয়া বিশাল পরিকল্পনা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর লক্ষ্য হলো চীন সমর্থিত বন্দর, রেলপথ, মহাসড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকাকে সংযুক্ত করা।

চীন ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ২৭৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। এটি বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম বিনিয়োগ। ইরাক থেকে তেল, কাতার থেকে গ্যাস কেনার পাশাপাশি আলজেরিয়া, মরক্কো, তুরস্ক, মিশর ও সৌদি আরবে অস্ত্র রপ্তানিও করে তারা। চীনারা মিশরকে কায়রোর বাইরে নতুন রাজধানী নির্মাণেও সহায়তা করছে এবং মক্কায় মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক নির্মাণ করেছে।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং তিন দিনের সৌদি আরব সফর করেছিলেন। সেই সময় তিনি আরব লীগ এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিলের (জিসিসি) সঙ্গে বেইজিংয়ের প্রথম শীর্ষ সম্মেলনও করেছিলেন। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এই সফরকে চীন ও তার দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে 'একটি নতুন ঐতিহাসিক যুগ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পার্সি আল-জাজিরাকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অর্থনৈতিক কারণে চীনের সঙ্গে থাকতে চায়। বেইজিংকে মতাদর্শগতভাবে নিরপেক্ষ বাণিজ্য অংশীদার হিসাবে দেখে তারা। চীনারা দীর্ঘকাল ধরে রাজনীতি থেকে মানবাধিকার পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ কোনো ইস্যুতে হস্তক্ষেপ না করার নীতি বজায় রেখেছে। এই নীতি তাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর তুলনায় 'কম বিতর্কিত মধ্যস্থতাকারী' হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।

তিনি বলেন, শুধু অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপ না করার নীতিই নয়, চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়ার অন্য একটি কারণ হলো- চীনকে তারা এমন কিছু করতে দেখেনি যা তাদের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে বা হুমকি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অপরদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের ক্ষেত্রেও এমন আচরণ দেখায় না, যা চীনারা দেখায়।

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও মধ্যপ্রাচ্যের রাজধানীতে অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞাকে 'হাতিয়ার' হিসেবে ব্যবহার করে, যা অন্যান্য দেশগুলোর জন্য একটা হুমকির বিষয়।

সংগৃহীত ছবি

সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ফ্যান হংদা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে। চীনের শক্তি মূলত তার অর্থনৈতিক প্রভাব এবং বিআরআই-এর মতো প্রকল্প। চীন কখনোই মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণ করতে চায়নি।

তিনি বলেন, আমি মনে করি না মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিতাড়িত করার কোনো পরিকল্পনা বেইজিংয়ের আছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কর্মকাণ্ডই চীনের পছন্দের নয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার জন্য চীনের নিজস্ব উপায় রয়েছে।

তেহরানের সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের চায়না-মিডল ইস্ট প্রজেক্টের পরিচালক জাকিয়া ইয়াজদানশেনাস বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সামরিক উপস্থিতি রাখার ইচ্ছা নেই বেইজিংয়ের।

লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের স্ট্র্যাটেজি, টেকনোলজি অ্যান্ড আর্মস কন্ট্রোলের অ্যাসোসিয়েট ফেলো মার্ক ফিটজপ্যাট্রিক বলেন, 'পুলিশ' বা 'নিরাপত্তা' সরবরাহকারীর ভূমিকা নিতে চীনের অনীহাই দীর্ঘমেয়াদে  টুলকিটকে সীমিত করতে পারে। সৌদি-ইরান সম্পর্ক বজায় থাকবে কিনা এবং চীন তা কার্যকর করতে পারবে কিনা এটি বড় একটি বিষয়। আমি মনে করি এটি কতটা স্থিতিশীল হবে তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ রয়েছে।

ইত্তেফাক/এসকে