পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটির পর আবারো কর্মব্যস্ত হয়ে উঠছে রাজধানী ঢাকা। ছুটি চলাকালীন সময়ে এই ম্যাগাসিটির বায়ুদূষণ কিছুটা হ্রাস পেলেও আবারও এখন বাড়ছে দ্রুত গতিতে। অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে রাজধানীর বাতাস। দূষণের উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণে না আনার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় কারণ হয়ে উঠেছে ঢাকার বিষাক্ত বাতাস।
প্রতি বছর ঈদের সময় দূষণের উৎসগুলো বন্ধ থাকার কারণে সহনীয় হয়ে ওঠে রাজধানীর বাতাস। ঈদের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছাড়েন। রাস্তায় যানবাহন চলাচল একেবারে কমে যায়। শিল্পকারখানাও বন্ধ থাকে। তাই দূষণের উৎসগুলো প্রায় বন্ধ থাকায় বায়ুর মানও ভালো হয়। কিন্তু এবারের ঈদে পাঁচ দিনের মধ্যে তিন দিনই বায়ু ছিল অস্বাস্থ্যকর।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর আগের সাত বছরে ঈদের সময় এমন দূষণ দেখা যায়নি। আট বছরের মধ্যে এই ঈদে বায়ুদূষণ ছিল শীর্ষে। এবারের ঈদের পাঁচ দিনে দূষণের গড় মান ছিল ১৫৩। গত বছরের ঈদুল ফিতরের পাঁচ দিনে এ মান ছিল ১৩৬। আর ঈদুল আজহায় গড় মান ছিল ৯৬। এর আগের কোনো ঈদে গড় মান এবারের মতো এত বেশি ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের বায়ুমান গবেষণাকেন্দ্রের হিসাবে, ধুলা ও ধোঁয়া ঢাকার বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ভূমিকা রাখে। এ ধুলার বড় উৎস অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে নির্মাণকাজ, ফিটনেসবিহীন পুরোনো যানবাহনের দূষিত বায়ু। আর ৪০ শতাংশ দূষণের উৎস খড়, কাঠ ও তুষের মতো জৈব বস্তুর ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের এক যৌথ প্রতিবেদনে ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়। এগুলো হলো—ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া ও নির্মাণকাজের ধুলা। নগরবিদ ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, দূষণের কারণ চিহ্নিত করা হলেও প্রতিকারের কার্যকর কোনো উদ্যোগ বা ব্যবস্থা নেই। দূষণ রোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে, তাই দূষণ বন্ধ হচ্ছে না। এই বিষাক্ত বাতাস স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় কারণ ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন দূষিত বাতাসে শ্বাস নেন এবং বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর প্রধানত নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশে আনুমানিক ৭০ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র-ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদারের নেতৃত্বে একটি গবেষণা হয়েছে। কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, গত সাত বছরই ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময় ছিল মে, জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস। ঐ সময় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। বায়ুদূষণের পরিমাণ কমে আসার অন্যতম কারণ এটি। অন্যদিকে এই সময় ঢাকার আশপাশের বৈধ এবং অবৈধ বেশির ভাগ ইটভাটা বন্ধ থাকে। তবে এবার ইটভাটাগুলোর সব বন্ধ হয়নি। আর ঈদ হয়েছে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে। সামান্য বৃষ্টি হলেও কয়েক দিনের প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে তা ততটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। একাধিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমান বর্ষাকাল বাদে প্রায় বছর জুড়ে ঢাকার বায়ু অস্বাস্থ্যকর, খুবই অস্বাস্থ্যকর এবং বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে ঘোরাঘুরি করছে। এই অবস্থায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে নগরীর বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও বক্ষব্যাধিতে আক্রান্ত এবং দীর্ঘসময় বাইরে কাজ করেন যারা, তারা রয়েছেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। এ অবস্থায় বায়ুদূষণঘটিত রোগব্যাধিও বাড়ছে।
বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. শামীমা আক্তার বলেন, বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি অ্যাজমা, সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ), এলপিডি (লিম্ফোপ্রোলিফারেটিভ ডিজিজ) ইত্যাদি রোগও দেখা দিচ্ছে। এলপিডির মতো রোগ আগে খুব একটা দেখা না গেলেও এখন এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে।
তিনি বলেন, বায়ুদূষণের কারণে যেসব রোগব্যাধি হয় তার জন্য দায়ী ধুলা ও বালির সঙ্গে মিশে থাকা ক্ষুদ্র আকারের পার্টিকেল বা কণা, যেগুলো আমাদের ফুসফুসে পৌঁছে ফুসফুসের ক্ষতি করছে। এর থেকে বাঁচার জন্য আসলে মাস্ক পরা বা সচেতনতাই সব নয়। মাস্ক ব্যবহার করলে ধুলার বড় পার্টিকেলগুলো আটকালেও ক্ষুদ্র পার্টিকেলগুলো ঠিকই ফুসফুসে পৌঁছে যায়।
বায়ুমণ্ডল বিজ্ঞান গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুস সালামের মতে একদিকে বৃষ্টি কমে যাওয়া ও অন্যদিকে ঢাকার বাতাসে ধুলার পরিমাণ বেড়ে গেছে। ঢাকার আশপাশে অবস্থিত কারখানা, বিশেষত ইটের কারখানাগুলোতে দূষণের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। তিনি বলেন, যেসব ধূলিকণার আকার ১০ পিএম বা এর কাছাকাছি অর্থাৎ কিছুটা বড়, সেগুলো নাকের মাধ্যমে ঢুকে গলা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা শরীরের এই অংশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। অন্যদিকে ২.৫ পিএমের চেয়ে বড় কিন্তু ১০ পিএমের চেয়ে ছোট পার্টিকেলগুলো আরও ভেতরে এবং আড়াই পেরিমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো সরাসরি ফুসফুসে পৌঁছে ফুসফুসের গায়ের ছিদ্রগুলো বন্ধ করে দেয়। টানা কয়েক মাস নিঃশ্বাসের মাধ্যমে এরকম ক্ষুদ্র আকারের ধূলিকণা গ্রহণ করতে থাকলে সেটা আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আরও ছোট কণাগুলো রক্তে মিশে যায় এবং আলট্রা ফাইন পার্টিকেল অর্থাৎ অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণাগুলো আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছে ক্ষতি করে। ধূলিকণা বলতে কেবল মাটির কণা নয়, এর মধ্যে অনেকরকম ধাতব কণাও থাকে, যা রক্তে মিশে লিভার, কিডনি ইত্যাদির ক্ষতি করে।
