মামাত ভাইয়ের সঙ্গে মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে নানাবাড়ি বেড়াতে যান ফরিদ। আবছা মনে পড়ে, মা সব গুছিয়ে দিয়েছিলেন। বাবা ব্যবসার কারণে গোমাতলীতে থাকায় তাকে বলে যেতে পারেননি। নানাবাড়ি যাওয়ার ছয়দিন পর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। এ বৃষ্টির সূত্র ধরেই বাংলাদেশের চট্টগ্রামের দক্ষিণ উপকূলে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল রাতে আঘাত হানে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়। সে ঘূর্ণিঝড়ে বাবা-মা সহ পরিবারের ৬ সদস্যকে হারিয়ে দিশাহীন হয়ে পড়ে ৯ বছরের ফরিদ।
কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার (সাবেক সদর উপজেলা) উত্তর গোমাতলীর বাসিন্দা বর্তমানে কক্সবাজার পৌরসভার বাসিন্দা বেসরকারি কর্মজীবী ফরিদুল আলম ফরিদ (৩৯)। শুক্রবার (২৮ এপ্রিল) রাতে ইত্তেফাকের কক্সবাজার জেলা অফিসে বসে সেই স্মৃতি বলতে গিয়ে আবেগ-আপ্লুত হন।
সে সময়ের স্মৃতি হাতড়িয়ে ফরিদ বলেন, ‘ঝড়ের পরদিন মা ও ছোট ভাই-বোনদের জন্য মন কাঁদায় ফিরে আসি ঈদগড়ের বাসায়। পৌঁছে দেখি ঘরে কেউ নেই। খবর পাই, আমি নানাবাড়ি যাবার পর বাবা এসে মা ও অন্যদের গোমাতলীতে চিংড়ি ঘের করতে নিয়ে যান। তারা অবস্থান নিয়েছিলেন মহেশখালী নদীর গোমাতলী তীরের জলিল সিকদারের ঘের পাড়ের বাসায়। জলোচ্ছ্বাসের স্রোত ঘরসহ সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এলাকায় বেঁচে যাওয়া স্বজনরা সবাই মিলে খোঁজ করে তাদের লাশও পায়নি।’
আবেগ আপ্লুত হয়ে ফরিদ বলতে থাকেন, ‘এনালগ যুগ, তার ওপর খেটে খাওয়া পরিবার হওয়ায় কোনো ছবি তোলা ছিল না- তাই ধীর ধীরে বাবা-মা ও নিখোঁজ ভাই-বোনের অবয়ব ভুলে গেছি। ৩২ বছরে এলাকায় অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু বাবা-মা, ভাই-বোন বিস্মৃতি হওয়ার স্মৃতি আমাকে পিছু ছাড়ে না কখনো। ২৯ এপ্রিল এলে তাদের কথা বেশি মনে পড়ে।’
ফরিদ জানান, সেদিনের প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ে দুই থেকে ছয় বছর বয়সী দুই ভাই, দুই বোন, বাবা-মাসহ স্বজন ও ঘর বাড়ি হারিয়েছিলেন তিনি।
শুধু তিনি নন, উপকূলের শত শত মানুষ তার মতো আপনজনকে হারিয়ে এখনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। তিন দশক পেছনে ফেলে এসেছেন তারা। কিন্তু হারানোর বেদনা তাদের কখনো নিস্তার দেয় না।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ফরিদ বলেন, ‘বাবা শামশুল আলম রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন মেম্বার ছিলেন। তবে তিনি সেখানে থাকতেন কম। গ্রীষ্মে লবণ ও বর্ষায় চিংড়িচাষে আয় ভালো হওয়ায় কক্সবাজার সদরের পোকখালীর গোমাতলী বাবার নানাবাড়ি এলাকায় থাকতেন তিনি। গোমাতলী মোহাজের উপনিবেশ ভূমিহীন সমিতির নামে লিজ নেওয়া জমিতে অন্যদের মতো চাষাবাদ করতো। মা নূর জাহান বেগম আমাদের নিয়ে ঈদগড় ও গোমাতলী আসা-যাওয়ায় থাকতেন। ১৯৯১ সালে আমার বয়স ৯ বছর হবে। আমার ছোট দুই ভাই ও দুই বোন ছিল মনে আছে। তবে তাদের নাম-চেহারা কিছুই মনে নেই।’
ততক্ষণে ফরিদের চোখে জল ছলছল করছে। ধীরে ধীরে ফরিদ বলেন, ‘স্বজনদের কাছ থেকে শুনি, দুষ্ট প্রকৃতির ছিলাম। স্কুল ফাঁকি দিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতাম। ঘূর্ণিঝড়ের আগে সুযোগ পেয়ে নানাবাড়ি বেড়াতে চলে যাই। সেখানে গিয়ে ফিরে এসে যে মা-বাবা, ছোট ভাই-বোনদের আর দেখতে পাবো না ঘূর্ণাক্ষরে জানলেও তাদের ছেড়ে যেতাম না। আমার বড় ভাই জিয়াউর রহমান বাবা ও মায়ের সঙ্গে না থেকে পাড়ার এক দোকানে অবস্থান করায় ভেসে যাওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। বাবা-মাকেও নাকি বেড়িবাঁধের ঘর থেকে চলে আসতে বলেছিলেন স্বজনরা। মৃত্যুর পয়গাম আসায় তারা হয়তো পাড়ায় ফেরেনি।’
তিনি বলেন, ‘এতিম হিসেবে বায়তুশ শরফে থাকার সুযোগ পেয়ে স্নাতক সম্পন্ন করার তৌফিক পেয়েছি। ২০১২ সালে নিকটাত্মীয় আসমাউল হোসনাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে দাম্পত্য জীবনে মুদ্দাসির রহমান (৭) ও মোবাস্সির রহমানকে (সদ্যজাত) নিয়ে বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানের হয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করে সুখেই কাটছে দিন। ব্যস্ততায় সময় কাটে, কিন্তু ৩২ বছর আগের সেই স্মৃতি আমায় পিছু ছাড়ে না। বাবা ও মা, ভাই ও বোন কারো অবয়ব মনে নেই, কিন্তু তাদের শূন্যতা বুকে ব্যথার জন্ম দেয়। তবে, আজকের জন্য প্রতীক্ষা নয়, প্রতিদিন প্রতিবেলা নামাজে আমার পরিবার ও সেদিন হারানো স্বজন, উপকূলবাসীর জন্য ঈছালে সওয়াব পাঠানো হয়।’
এবার ফরিদ জানান আক্ষেপের কথা। হতাশের সুরে বলেন, ‘৩২ বছরে এলাকার যাতায়াত-যোগাযোগ অবস্থার উন্নয়ন হয়েছে অনেক। এলাকায় এলাকায় উঠেছে বহুতল সাইক্লোন শেল্টার। এখন ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত পড়লে গভীর রাতেও নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া যায়। ১৯৯১ সালে যেটি ছিল দুরূহ। তবে, আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ভালো হলেও গোমাতলীর চারপাশের বেড়িবাঁধ ১৯৯১ সালের মতোই নাজুক, জোড়াতালি দিয়ে মেরামত চলে আসছে। এখনো অমানিশা (অমাবস্যা)-পূর্ণিমার জোয়ার কিংবা কোনো দুর্যোগে সাগরে পানি বাড়লে এলাকা এলাকায় বেড়িবাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে ঢোকার খবর প্রচার হয়।’
প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালের এই দিনে স্মরণকালের সেই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস চট্টগ্রাম কক্সবাজারের দ্বীপাঞ্চলসহ উপকূলীয় এলাকা তছনছ করে এক মহাধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করেছিল। রাতের অন্ধকারে কয়েক ঘণ্টায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল উপকূলীয় এলাকা।
১৯৯১ এর ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপকূলে স্থাপিত হয় ৫ শতাধিক ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র। যার মধ্যে অনেকগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে মহেশখালী, পেকুয়া, সদর উপজেলা এলাকা এবং টেকনাফের বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধ বিলীন হয়েছিল। ওই ভাঙা বাঁধ এখনও পরিপূর্ণ মেরামত হয়নি। ফলে উপকূলের লাখো মানুষ এখনো ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন। তাই সংকেত দেখা দিলেই নিরাপদে ছুটতে হয় তাদের। উপকূলবাসীর দাবি, পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার করে যেন টেকসই করা হয়।
