জমে উঠেছে মৌসুমি কৃষিশ্রমিকের হাট 

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৩, ০০:৫১

চলছে বোরো ধান কাটার মৌসুম। কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টির ভয়ে গৃহস্থরা চাইছেন যত দ্রুত সম্ভব ধান কেটে ঘরে তুলতে। ধান কাটতে প্রয়োজন কৃষিশ্রমিক। গৃহস্থের এই চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন স্থানে জমে উঠেছে মৌসুমি কৃষিশ্রমিকের হাট। এসব হাট থেকে গৃহস্থরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষিশ্রমিক সংগ্রহ করছেন। এলাকাভেদে শ্রমিকদের দৈনিক হাজিরা বেশ খানিকটা ওঠানামা করতে দেখা যাচ্ছে। আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:

নিকলী (কিশোরগঞ্জ) :সূর্য পূর্ব গগনে উদয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার সদর ইউনিয়নের কালীবাড়ি বটতলা ও গরুচরা ঘাটে চোখে পড়ে শত শত মানুষের জটলা। সূর্য ওঠার আগে থেকেই অভাবী লোকজন ছুটে এসেছেন হাটে। চোখেমুখে তাদের অসহায়তার ছাপ। হাটে একশ্রেণির মানুষ এসেছেন ‘বিক্রি’ হতে, আরেক শ্রেণির মানুষ এসেছেন কিনতে। চলতে থাকে দরদাম, ওঠানামা করে পণ্যের মতোই। স্থানীয় ভাষায় কেউ তাদের বলে দাওয়ালী, কেউ বলে মুনি। ভদ্র ভাষায় অনেকে ডাকেন কৃষিশ্রমিক বলে। এখন চলছে বোরো ধান কাটার মৌসুম। এ সময় নিকলীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষিশ্রমিকেরা এসে শ্রমিকের হাটে বসেন।

শনিবার সকালে নিকলী শ্রমিকের হাট ঘুরে দেখা যায়, নিকলী, জারুইতলা, মামুদপুর, করগাঁও, পূর্বগ্রাম, চামারঠুলা, কুর্শা, পাঁচরুখীসহ বিভিন্ন গ্রামের অভাবী লোকজন এসেছেন কাজের সন্ধানে। এই মৌসুমে নিকলীসহ কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বেশি। ভোর সাড়ে ৫টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে এই শ্রমিকের হাট। কেউ ‘বিক্রি’ হন এক দিন, কেউ পাঁচ দিন, কেউ সাত দিন, কেউ আবার ১০ দিনের জন্য ‘বিক্রি’ হন। দূর থেকে যাঁরা এই হাটে আসেন, তাঁরা বেশি দিনের জন্য, স্থানীয় শ্রমিকেরা প্রতিদিনের জন্য ‘বিক্রি’ হচ্ছেন। এই অঞ্চলে বোরো ধান কাটা শুরু হওয়ায় শ্রমিকের হাটও জমে উঠেছে। বর্তমানে ১১০০ থেকে ১২০০ টাকায় প্রতিদিন হিসেবে শ্রম বিক্রি হচ্ছে। কালীবাড়ি বটতলা ও গরুচরা ঘাটে শ্রমিকের হাটে কথা হয় মামুদ গ্রামের মগবুল মিয়া (৫০), সাইফুল (৩২), কাজল (২৯) ও নুরু মিয়ার (৩৮) সঙ্গে। তারা বলেন, প্রতি বছরই এই সময়ে তারা নিকলী বটতলা ঘাটে আসেন ধান কাটার জন্য। এ সময় শ্রমিকের দাম বেশি থাকে। এক মাস কাজ করলে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়িতে ফিরতে পারেন। 

নিকলীর সিংপুর ইউনিয়নের সিংপুর গ্রামের কৃষক কাবিল সর্দার বলেন, আজকালকার শ্রমিকেরা নবাবি স্টাইলে চলেন। ঘড়ি দেখে কাজ করেন। একে তো চাল, ডাল, তেল ও মাছের দাম বেশি; পাশাপাশি একজন কৃষিশ্রমিকের তিন বেলা খাবার দিতে খরচ হয় ১৫০ টাকা। নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুছাম্মত্ শাকিলা পারভিন জানান, কৃষিশ্রমিকদের সুবিধার জন্য উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চারটি টিউবয়েল ও চারটি স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট দেওয়া হয়েছে। নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুনসুর আলী আরিফ জানান, দূর-দূরান্ত থেকে আসা কৃষিশ্রমিকেরা সারা দিন কাজ করে রাতে টাকা নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় ঘুমান। তাদের নিরাপত্তার জন্য চলতি এক মাস সদরে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জের শিয়ালকোল, কান্দাপাড়া, কাজীপুরের নাটুয়ারপাড়া, আলমপুর, কুমারিয়াবাড়ী, পানাগাড়ী, রতনকান্দি ও সোনামুখী এলাকায় কৃষিশ্রমিক বিক্রির হাট এখন জমজমাট। প্রতিদিন সকালে হাট শুরু হয়। বতর্মানে মাঠে পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। তাই কৃষিশ্রমিকদের চাহিদা অনেক বেশি। এখানে দিন হিসেবে ৫০০ টাকার কমে শ্রমিক পাওয়া কঠিন।

নাটুয়ারপাড়া গ্রামের গৃহস্থ আব্দুস সালাম জানান, কামলার দাম গত বছরের চেয়ে এবার বেশি। তবু কিছু করার নেই। বেশি দাম দিয়েই কামলা নিয়ে যেতে হচ্ছে। কাজীপুর উপজেলার মাজনাবাড়ী গ্রামের কৃষক আমির হোসেন বলেন, ‘আমি নাটুয়ারপাড়া থেকে ৫০০ টাকা দরে পাঁচ জন কামলা (শ্রমিক) কিনছি। উত্তরবঙ্গের কামলাদের কাজের মান ভালো। কাজে কোনো ফাঁকি দেয় না। তাদের তিনবেলা খাবার দিতে হয়। আর কাজ করে ভোর থেকে একটানা সন্ধ্যা পর্যন্ত।

 

ইত্তেফাক/ইআ