বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘বর্ষার রানি’

আপডেট : ২২ জুন ২০১৯, ০৩:১৪

ছোট ছোট টিলার গায়ে চায়ের বাগান দেখে মনে হয় যেন উঁচু থেকে জলপ্রপাতের ধারা নেমে এসে বয়ে চলে গেছে দূরে। তার মাঝদিয়ে সরু পায়ে চলা পথ। এঁকেবেঁকে চলে গেছে কোথায় কে জানে! রোদের খরতাপ নেই। বরং চারপাশে স্নিগ্ধ আলো-ছায়ার খেলা। বর্ষা এলে সিলেটের এই ছবিটা বদলে যায়। আকাশ এই মেঘে কালো হচ্ছে, তুমুল বৃষ্টি নেমে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পাহাড়, বন, চায়ের বাগান। পানির ঢল পাহাড় গড়িয়ে নালা বেয়ে নামছে তীব্র ধারায়। বৃষ্টির ছোঁয়া পেয়ে খুশিতে যেন বান ডাকে সবুজ পাতায়। সবুজ টিলার সারি, ভরা যৌবনা হাওর আমন্ত্রণ জানায় সেই রূপে ডুব দেওয়ার জন্য। একটু পরেই আবার রোদ ঝলমলে। এখানকার প্রকৃতি এমনই খেয়ালি।

বর্ষায় সিলেটের রূপ এভাবেই বদলে যায়। বর্ষাকালে ময়ূরের মতোই পেখম মেলে ধরে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’র এই দেশ। এ কারণেই সিলেটকে বলা হয় ‘বর্ষার রানি’। তাই বর্ষায় এখানে ভ্রমণের মজাই অন্যরকম। অবশ্য সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলায় পর্যটকদের আনাগোনা চলে বছরজুড়েই।

সিলেট বিভাগের চার জেলা সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটে রয়েছে অসংখ্য পর্যটন স্পট। সিলেটের নানা স্থানে ছড়িয়ে আছে নয়নজুড়ানো মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। চা-বাগান, বন-বনানী, নদী, বিশাল হাওর—এক অপূর্ব সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেট। জাফলং, মাধবকুন্ড, পাংথুমাই, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, লোভাছড়া চা-বাগান, লালাখাল, ভোলাগঞ্জ, মালনীছড়া চা বাগান, হাকালুকি হাওর, হযরত শাহজালাল (র) ও হযরত শাহ পরানের (র) মাজার, জৈন্তাপুর পুরানো রাজবাড়ি, মাধবপুর লেক, তামাবিল, মরমী কবি দেওয়ান হাছন রাজার বাড়ি ও জাদুঘর, সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর, মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য দেবের বাড়ি, আলী আমজাদের ঘড়ি, মনিপুরী রাজবাড়ি ও মিউজিয়াম, রেমা-কালেঙ্গা বন, টিলাগড় ইকো পার্কসহ অসংখ্য পর্যটন স্পট রয়েছে সিলেটে।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান: মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল অবস্থিত। বিভিন্ন প্রকার গাছগাছালি ও পশুপাখি এ বনের শোভা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর নান্দনিক সৌন্দর্যের অন্যতম স্থান এই জাতীয় উদ্যানটি দেশে ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট হিসেবে খ্যাত। এই উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। লাউয়াছড়া উদ্যানই বিলুপ্তপ্রায় উলু্লকের সবচেয়ে বড় বিচরণ এলাকা। বনের সৌন্দর্যকে কাছ থেকে দেখার জন্যে আছে তিনটি ট্রেইল। ট্রেকিং-এর সহায়তার জন্য আছে গাইড। উঁচু-নিচু ও আলো আঁধারের চোখ ধাঁধানো খেলা, পাখির কিচিরমিচির, ঝিঁঝিঁ পোকার গান— সবকিছু মিলিয়ে অদ্ভুত জাদুতে আপনাকে বিমোহিত করে রাখবে।

প্রকৃতি কন্যা জাফলং: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে প্রকৃতির রূপের পসরা সাজিয়ে আছে জাফলং। সিলেট থেকে জাফলং-এর দূরত্ব মাত্র ৬২ কিলোমিটার। পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ পানির ধারা, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রিজ, উঁচু উঁচু পাহাড়ে সাদা মেঘের খেলা জাফলংকে করেছে অনন্য। একেক ঋতুতে জাফলং একেক রকম রূপের প্রকাশ ঘটায়; যা পর্যটকদেরকে ভ্রমণের জন্য সারাবছরই আগ্রহী করে রাখে।

রাতারগুল: দেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুল সিলেট জেলা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত। এই জলাবনটি প্রায় ৩০ হাজার ৩২৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। রাতারগুল ‘সিলেটের সুন্দরবন’ নামে খ্যাত। এই রাতারগুল জলাবন বছরে চার থেকে পাঁচ মাস পানির নিচে তলিয়ে থাকে। তখন জলে ডুবে থাকা বনের গাছগুলো দেখতে সমগ্র বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটকরা এসে ভিড় জমান। অনেক পর্যটক রাতারগুলকে ‘বাংলাদেশের আমাজন’ বলেও ডাকেন। সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর (বর্ষার শেষের দিকে) পর্যন্ত রাতারগুল ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। ১৯৭৩ সালে বনবিভাগ রাতারগুল বনের ৫০৪ একর জায়গাকে বন্যপ্রাণির অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করেছে।

মালনীছড়া চা বাগান: মালনীছড়া চা বাগান উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় এবং প্রথম চা বাগান। ১৮৪৯ সালে লর্ড হার্ডসনের হাত ধরে ১ হাজার ৫০০ একর জায়গায় এই চা বাগানের যাত্রা শুরু। চা বাগানটি এখন বেসরকারিভাবে পরিচালিত হলেও পর্যটকদের কাছে এ চা বাগানের কদর বেশ। অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে হয়। এখন এই চা বাগানে কমলা ও রাবারের চাষও হচ্ছে।

ভোলাগঞ্জের পাহাড়ি ঝরনা: ভোলাগঞ্জ সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী কোম্পানিগঞ্জে অবস্থিত। ভোলাগঞ্জের একপাশে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের উঁচু উঁচু পাহাড়। সেই পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনার পানির প্রবাহ ধলাই নদীর উত্সমুখ। এখানে আসার সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে জুন থেকে সেপ্টেম্বর।

বিছানাকান্দি: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়নে এই বিছানাকান্দি। সীমান্তের খাসিয়া পাহাড়ের অনেকগুলো ধাপ দুই পাশ থেকে এসে এক বিন্দুতে মিলেছে। পাহাড়ের খাঁজে রয়েছে ভারতের মেঘালয়ের সুউচ্চ ঝরনা। বর্ষাকালই বিছানাকান্দি ভ্রমণের ভালো সময়। পর্যটকদের কাছে বিছানাকান্দির মূল আকর্ষণ হচ্ছে পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলা স্বচ্ছ জলধারা আর পাহাড়ে পাহাড়ে শুভ্র মেঘের উড়াউড়ি।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান: হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার রঘুনন্দন পাহাড়ে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান অবস্থিত। সাতটি পাহাড়ি ছরা বা ঝরনা থেকে এই স্থানের নামকরণ। এখানে রয়েছে প্রায় ১৪৫ প্রজাতির গাছপালা, ৬ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং প্রায় ১৫০ প্রজাতির পাখি।

সংগ্রামপুঞ্জি ঝরনা: এ ঝরনার অন্য নাম মায়াবি ঝরনা। জাফলং জিরো পয়েন্ট থেকে এ ঝরনায় যেতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। বিজিবির তত্ত্বাবধানে এ ঝরনা দেখতে যাওয়া যায়। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য আদর্শ জায়গা এই ঝরনা। এখানে রয়েছে একটি সুড়ঙ্গ। এই সুড়ঙ্গের শেষ এখন পর্যন্ত অজানা।