আষাঢ়ে ভূতের গল্প

আপডেট : ২২ জুন ২০১৯, ১৮:২৮

 

সত্যজিত্ বিশ্বাস

 

এক.

—বিল্টু রে, কী মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে দেখেছিস?  

—বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। আচ্ছা পল্টু বল তো, এই বৃষ্টির মধ্যে কী করা যায়?

—চল, ল্যাপটপে ভূতের সিনেমা দেখি।    

—তোর ভূত দেখার এত শখ? তাহলে চল, লাইভ ভূত দেখে আসি। 

—লাইভ ভূত মানে? 

—লাইভ ভূত মানে, লাইভ ভূত। আই মিন জ্বলজ্যান্ত ভূত। চল, দেখা করে কথা বলে আসি।

—ভূতের সাথে দেখা করে কথা বলে আসবি? মাথা কী ঠিক আছে? 

—মাথা ঠিক আছে কি না সেটাও না হয় পরীক্ষা হয়ে যাবে। চল তাহলে এখনই বের হয়ে পড়ি।

—সত্যি সত্যি যাবি? কোথায় ওটা?

—বেশি দূর না তো। ওই যে পুরোনো জমিদার বাড়িটায়। চল তো এখন। 

 

দুই.

—দোস্ত, আমার খুব ভয় করছে রে! কেমন একটা গা ছমছম করা পরিবেশ। নিশ্চিত কোথাও সাপ খোপ আছে।

—আরে ভীতুর ডিম, ভালো করে তাকিয়ে দেখ। ওয়াও! কী ভৌতিক পরিবেশ, জায়গাটার মধ্যে একটা কামড় আছে রে।

—কী আছে বললি? কামড় আছে মানে? কার কামড়? ভূতের না সাপের?  

—আমি নিশ্চিত এখানে ভূত আছে। শোন, ভূতের বাড়িতে সাপ থাকে না। ভূতেরা এসব ব্যাপারে খুবই সেন্সেটিভ। নিজেরা যেখানে থাকে, সেখানে অন্য কারো মাতব্বরি সহ্য করতে পারে না। 

—তুই এত কিছু জানিস কী করে?  

—(বিল্টু বিড়বিড় করে বলল) চাপা পিটাতে গেলে এসব জানতে হয় রে বন্ধু, জানতে হয়।  

—কী বলিস ফিসফিস করে? জোরে বল।  

—বলছি, এত কথা না বলে এবার চল তো। জমিদার বাড়ির ওই বড় হল রুমটায় কী আছে দেখি? ইশ, একবার যদি ভূতের দেখা পেতাম।   

—মানুষ ভূতের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য দোয়া চায় আর তুই দোয়া চাস দেখা হবার জন্য! তোর প্ল্যানটা কী বল তো?

—সেটা ভূতের দেখা পেলেই বুঝবি।

 

তিন.

বড় হলরুমের সিলিংয়ের ওপর বসা দুই ভূত বন্ধু নুলো আর ভুলো। 

নুলো :শুঁনলি, বিঁল্টু বাঁদরটার কঁথা? ইঁচ্ছা কঁরছে সাঁমনে গিঁয়ে জিঁজ্ঞাসা কঁরি, চিঁনিস আঁমাকে?

ভুলো :আঁরে দাঁড়া নাঁ। দেঁখ, কেঁমন ভঁয় দেঁখাই ওঁদের।

নুলো :হাঁ, হাঁ, হাঁ চঁল তাঁহলে।

 

—বিল্টু, ও বিল্টু ওই যে শূন্যে ওই দুইটা কী ভাসে রে? ওরে বাবা ভূত না তো? 

—পল্টু, তুই এত ভীতু কেন বল তো? কই, কোথায় কী?

—হেঁ হেঁ হেঁ এঁই যেঁ আঁমরা এঁখানে। আঁমি হঁলাম ভুঁলো, আঁর আঁমার পাঁশের জন নুঁলো। কীঁ হেঁ সাঁহসী বিঁল্টু, কঁথা বঁলছ নাঁ কেঁন? ভঁয় পেঁয়েছ? 

—বিল্টু কখনো ভয় পায় না। তোমরা যে আসল ভূত তার প্রমাণ কী? তোমাদের আইডি কার্ড দেখাও। 

(নুলো-ভুলো একে অপরের দিকে তাকিয়ে)

—নুঁলো রেঁ এঁ ছেঁলে বঁলে কীঁ? ভূঁতের আঁবার প্রঁমাণ লাঁগে নাঁকি?

—নুলো আবার কী বলবে? আমি বিল্টু বলছি, মন দিয়ে শোন, আগে আইডি কার্ড লাগত না, এখন লাগে। সারা পৃথিবী ভরে গেছে ভেজাল ভূতে। দুই মিনিট সময় দিচ্ছি, যাও নিয়ে আসো তোমাদের আইডি কার্ড।

(নুলো, ভুলো উড়ে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করে এলো) 

—ইঁয়ে মাঁনে চেঁনা ভূঁতের পৈঁতা লাঁগে নাঁ। আঁমরা এঁই যেঁ শূঁন্যে ভাঁসছি, নাঁকি সুঁরে কঁথা বঁলছি, মাঁনুষকে ভঁয় দেঁখাচ্ছি, মাঁনুষ আঁমাদের দেঁখে ভূঁত ভূঁত বঁলে দৌঁড়ে পাঁলাচ্ছে এঁটাই তোঁ বঁড় প্রঁমাণ। 

—সত্যি বলছ তো?

—সঁত্যি মাঁনে? এঁক সঁত্যি, দুঁই সঁত্যি, তিঁন সঁত্যি।  

—ওরে পল্টু, তাড়াতাড়ি একটা ছালা অথবা বস্তা নিয়ে আয় তো কোথাও থেকে। আসল ভূত পেয়েছি।

—কিঁ ব্যাঁপার, এঁসব কীঁ? আঁমার বাঁপ-দাঁদারা যেঁ গঁল্প কঁরত, ভূঁতের কঁথা শুঁনলেই মাঁনুষ দৌঁড়ে কুঁল পাঁয় নাঁ, আঁর দেঁখলে তোঁ কঁথাই নেঁই, সোঁজা হাঁর্টফেল। তাঁহলে তোঁমরা ভঁয় পাঁচ্ছ নাঁ কেঁন?  

—আরে রামছাগল ভূত, গল্প কি তোদের বাপ-দাদারাই করত? আমাদের বাপ-দাদারা করত না? আমাদের বাপ-দাদারা যে ভুল করে গেছে, সেই ভুল কি আমরা আর করি? 

—তাঁর মাঁনে? 

—তার মানে হলো, তোদের দুইটাকে বস্তায় ভরে চড়া দামে বিক্রি করব। আসল ভূতের মার্কেট রেট সেইইই।

—ওঁরে ভুঁলো রেঁ, চঁল পাঁলাই। বাঁচাও, বাঁচাও মাঁনুষ, মাঁনুষ!