বলছিলাম কী!

আপডেট : ২২ জুন ২০১৯, ১৮:২৯

 

ইকবাল খন্দকার

 

প্রথম ম্যাচ ঠিক ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে খেলা, দুর্দান্ত জয়। এরপর যা হয়েছে, সেগুলো ঠিক নেই। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে হার, ইংল্যান্ডের সঙ্গে হার, বৃষ্টির কারণে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ড্র, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হার। ধুর, হলো কিছু এইসব! মেজাজ খারাপ হয়ে গেল আমার। আরে এইভাবে হারতে থাকলে তো সেমিফাইনালে যাওয়া হবে না। আর সেমিফাইনালে যেতে না পারলে ফাইনালে যাবে কিভাবে? কাপ জিতবে কিভাবে?

সিদ্ধান্ত নিলাম, পরের ওপর আর ভরসা নয়, যা করার নিজেকে করতে হবে। মোড়ের দোকানে গেলাম। দুটো ব্যাট কিনলাম, দুটো বল। পাড়ার ছেলেপুলের খোঁজ নিলাম। সবাই স্কুলে চলে গেছে। কেউ কেউ কলেজে। বিকেলের আগে ফিরবে না। কিন্তু আমার এতক্ষণ অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য নেই। বাড়িতে তিন তিনটা পোষা বিড়াল ছিল। দুটো কুকুর। আর তিনটা ছাগল, তিনটা গরু। মোট কয়টা হলো জানি না। যে কয়টাই হোক, সব কয়টাকে দাঁড় করিয়ে দিলাম মাঠের বিভিন্ন পয়েন্টে। মানে এরা ফিল্ডিং করবে, আমি ব্যাটিং করব। দাঁড়িয়ে গেলাম ব্যাট হাতে। প্রথমে গরুকে বললাম বোলিং করার জন্য। গরু রাজি হলো না। লেজের জন্য নাকি তার বোলিং করতে সমস্যা।

ছাগলকে বললাম, ‘বোলিং করো।’

ছাগল বলল, ‘আমি আসলে অলরাউন্ডার না। আমি কেবল ব্যাটিংটাই করতে জানি। বোলিং না।’

কুকুর-বিড়ালকে বোলিংয়ের অনুরোধ করার পর তারাও বেশ শক্ত অজুহাত দাঁড় করালো। যেমন কুকুর বলল সে নাকি ইনজুরিতে আছে। হাড্ডি চিবাতে গিয়ে দাঁতের ফিলিং ছুটিয়ে ফেলেছে। বোলিং করতে গেলে প্রথম চোটটা নাকি দাঁতেই লাগে। আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। তাই বলে হাল ছাড়লাম না। চিন্তা করার জন্য কিছুক্ষণ সময় নিলাম কেবল। এরপর একটা যুগান্তকারী পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেললাম। নিজের বলে নিজেই ব্যাটিং। মানে বোলিং করার মতো কাউকে খুঁজে না পেয়ে আমি নিজেই বোলিং করলাম, নিজেই পেটালাম চার-ছক্কা। পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো ক্রিকেটার নিজের বলে নিজে ব্যাটিং করেছে বলে আমার জানা নেই। খেলা শেষ হলো।

আমি গরু-ছাগল-কুকুর-বিড়ালের সঙ্গে বিরাট ব্যবধানে জিতলাম এবং বিরাটরকম আত্মবিশ্বাস অর্জন করলাম। এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠ থেকে বাড়ি ফিরেই ফোন করলাম আইসিসির চেয়ারম্যানকে। আমার আসলে জানা ছিল না চেয়ারম্যান সাহেবের মোবাইলে যে আমার নম্বর সেভ করা আছে। যাক, এই কথা সেই কথা বলে মূল আলোচনার দিকে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমার আগেই সেদিকে চলে গেলেন চেয়ারম্যান সাহেব। আমাকে অনুরোধ করলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমে যুক্ত হওয়ার জন্য। না না, খেলোয়াড়দের পানি খাওয়ানোর জন্য না। খেলার জন্য। আমি চেয়ারম্যানের অনুরোধ ফেললাম না। যোগ দিলাম বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের সঙ্গে। কিভাবে যোগ দিলাম, সেটা একটু বলি। ভিসা পাসপোর্ট রেডি ছিল না। তাই একটু টেনশনে ছিলাম। ঠিকঠাক পৌঁছাতে পারব তো? কিন্তু টেনশনটাকে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ব্যাগ নিয়ে। রাস্তায় উঠতেই দেখি এক ভটভটি চালক ডাকছে, ‘এই ইংল্যান্ড! ইংল্যান্ড।’ আমি ভটভটিতে উঠে বসলাম। আর এক টানে পৌঁছে গেলাম ইংল্যান্ডে। আমাকে পেয়ে দলের সদস্যরা সে কী খুশি। তবে আগামী ম্যাচগুলো কেমন হবে, জিততে পারব কি পারব না—এইসব টেনশনের কারণে তারা খানিকটা চিন্তিতও ছিল।

আমি বললাম, ‘কোনো চিন্তা করা যাবে না। আমি যেখানে আছি, সেখানে আবার চিন্তা কিসের?’

পরদিন। সঠিক সময়েই খেলা শুরু হলো। তবে আকাশ থেকে তখন কলস দিয়ে পানি ঢালার মতো করে বৃষ্টি পড়ছে। আম্পায়ার অবশ্য বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ রাখতে চেয়েছিল।

আমি বললাম, ‘না, এইসব চলবে না। আপনার সর্দির সমস্যা থাকতে পারে। আমার কোনো সর্দি নেই। অতএব, যত বৃষ্টিই হোক, খেলা হবে।’

খেলা শুরু হলো। আমি এক হাতে ব্যাট আর এক হাতে ছাতা নিয়ে মাঠে নামলাম। পুরো মাঠ তখন খালি। কী আর করা! আগের অভিজ্ঞতাটাই কাজে লাগালাম। মানে নিজের বলে নিজের ব্যাটিং। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। ম্যাচ জিতলাম। বাংলাদেশ হয়ে গেল চ্যাম্পিয়ন। স্টেডিয়ামের গেটে সেই ভটভটিওয়ালা তখনই দাঁড়িয়েছিল। আমি কাপ নিয়ে লাফ মেরে উঠে গেলাম ভটভটিতে।