বনলতা সেনের ক্রাশ

আপডেট : ২২ জুন ২০১৯, ১৮:৩০

রুবেল কান্তি নাথ

 

‘বিয়ে করলে কি প্রেম করা যায় না?’ প্রশ্নটা এলো ওর কাছ থেকে।                ‘লে হালুয়া! এটা কী ধরনের কথা রে, বাপু? বিয়ে করলে প্রেম করা যাবে না কেন? আলবত করা যাবে। তবে আমার মতে, সেই প্রেম করার মানুষটা হতে হবে প্রিয় সহধর্মিনী।’ এ কথা বলায় মেসেঞ্জারে রাগের বেশ কটা ইমোজি পাঠাল মেয়েটা।

আমি কী করে ওকে বোঝাই যে, আমি প্রেমে অভ্যস্ত নই। আমার এসব ইতং-বিতং ভালো লাগে না। নিজেকে নিয়ে সর্বদা মশগুল থাকতেই পছন্দ করি। আর মেয়েদের কাছ থেকে শত হস্ত দূরে থাকতেই বেশি ভালোবাসি। সত্যি বলতে কি, মেয়েদের আমি যমের মতো ভয় পাই।

স্কুল বা কলেজজীবনে মেয়ে সহপাঠীদের পারতপক্ষে এড়িয়ে চলতাম। কেউ কোনো অজুহাতে আমার কাছে ঘেঁষতে চাইলে নিজেকে কচ্ছপের মতো খোলসের ভেতর গুটিয়ে নিতাম। এখনো যে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, তা হলফ করে বলা যাবে না।

একবার হাইস্কুলের বেশ কজন বান্ধবী প্ল্যান করেছিল, আমাকে যেকোনো উপায়ে নাস্তানাবুদ করবে। তাই ওরা জোট বেঁধে স্কুল শেষে আমার পেছনে লেগেছিল।

এহেন পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শেষে বুদ্ধি খাটিয়ে বাড়ির কাছাকাছি এসে আমাদের পোষা কুকুরটিকে ওদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর ওদের লম্ফঝম্ফ দেখে কে! ‘বাবা রে, মা রে’ বলে গগনবিদারী চিত্কার দিয়ে সবাই যে যার আপন প্রাণ বাঁচাতে উল্টো আমাদের বাড়িতেই ঢুকে পড়েছিল।

মা আমার এহেন কুকাম দেখে কষে ঝাড়ি দিয়েছিলেন। আর ওদের করেছিলেন নাস্তা দিয়ে খাতির। আহা রে! সরলমনা মা আমার বুঝতে পারেননি যে, এই খাণ্ডারনিরা তাঁর পেয়ারের পুত্রধনের বারোটার পাশাপাশি তেরোটা বাজাতে চেয়েছিল। ওদের শাস্তি দেওয়ার বদলে তিনি উল্টো মহব্বত করেছিলেন।

হায় রে, পোড়া কপাল আমার!

 

দোকানে কোনো জিনিস কিনতে গেলে যদি দেখতাম, সেখানে কোনো মহিলা কাস্টমার দাঁড়িয়ে আছেন, আমি ভুলেও আর দোকানটার কাছে ঘেঁষতাম না। মহিলা সাহেবার গা ঘেঁষে দাঁড়ানো তো বহুত দূর কি বাত! যতক্ষণ না আমার বিপরীত লিঙ্গের ওই ক্রেতা বিদায় না হতেন, ততক্ষণ দোকানের বাইরে ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’র মতো দাঁড়িয়ে থাকতাম।

যে আমি নারী জাতিকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধার সঙ্গে ভয়ও পাই, সেই নারী জাতির কিছু গর্বিত সদস্য আমার মতো নিরীহ, গোবেচারা, অবলা, অসহায় পুরুষটার ওপর ক্রাশ খেতে চায়! ওদের ঘরে কি মা-বোন থুড়ি, বাপ-ভাই নাই?

ফেসবুক বা মেসেঞ্জারে আমি পারতপক্ষে অচেনা কারো সঙ্গে আগবাড়িয়ে যোগাযোগ করি না। যদি তিনি হন কোনো সম্মানীত নারী, তাহলে তো একশ দশ হাত দূরে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করি।

বেশ কিছুদিন ধরে ‘বনলতা সেন’ নামে একজন আমাকে মেসেঞ্জারে জ্বালিয়ে মারছে। ওকে যতবারই বলি, ‘আমি মৃত থুড়ি, বিবাহিত।’

তবু সে শুনতে নারাজ। ওর কথা হলো, ‘বিবাহিত হলে প্রেম করা যাবে না কেন?’

মর জ্বালা! এই বনলতা ম্যাডাম জীবনানন্দ বাবুকে না খুঁজে আমার মতো ভ্যাবলাকান্তের পেছনে লেগেছে কেন? রহস্যটা কোনোভাবেই উদ্ধার করতে পারছি না।

যতই ওকে এড়াতে চাইছি, ততই জোঁকের মতো জেঁকে ধরছে।

‘হে বিধি, এই খাণ্ডারনির হাত থেকে আমার মতো নিরীহ পুরুষটাকে রক্ষা করো। রক্ষা করো এই অবলা পুরুষটার কৌমার্য।’

ধ্যাত্, কী বলতে কী বলি! আসল কথা হলো, বাসর রাতে বিড়াল মারার পরই তো আমার কৌমার্য শেষ!

 

সেদিন রাতে খেয়েদেয়ে ফেসবুকে ঢুকতেই বনলতার মেসেজ। এই জলজ্যান্ত বিভীষিকাটাকে নিয়ে আমি কই যাই? সে লিখেছে, ‘আজ তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।’

বাবা গো! এই মেয়ে তো ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’-তে চলে এসেছে। আগামীকাল বোধহয় ‘তুই-তুকারি’ শুরু করে দেবে। আমার এখন কী হবে গো!

ও আর আমাকে কী সারপ্রাইজ দেবে, এসব ঘটনা জানতে পারলে তো বউ সাহেবা আমার পিঠের ওপরই সারপ্রাইজের সুনামি বইয়ে দেবে। বউয়ের কথা ভাবতে ভাবতেই যমদূত এসে পড়েছে থুড়ি, বউ সাহেবা কাজকর্ম সেরে বিছানায় চলে এসেছে। বউয়ের সামনে ওই মুহূর্তে বনলতার সঙ্গে চ্যাটিং করা মানে, দাওয়াত দিয়ে সাক্ষাত মৃত্যুকে কাছে ডেকে আনা। সুতরাং চ্যাটিং আপাতত ফুলস্টপ।

কথা নেই বার্তা নেই, হঠাত্ বৃষ্টির মতো আমার বুকে মাথা রেখে বউ সাহেবা বলে উঠল, ‘মফিজ, আমিই সেই বনলতা এবং এটাই তোমার সারপ্রাইজ!’

যা বোঝার ততক্ষণে বুঝে গেছি আমি। ফেক আইডি দিয়ে আমাকে পরখ করে দেখেছে প্রিয় মানুষটি। কেই বা চায়, তার প্রিয় মানুষটি অন্যের হয়ে যাক। অন্যের পেছনে সময় কাটাক। অন্যকে নিয়ে ভাবুক।

অফিসের ব্যস্ততার জন্য বেচারীকে তেমন সময় দিতে পারি না। আজ ভালো করে তাকালাম আমার প্রাণপ্রিয় অর্ধাঙ্গিনীর দিকে। মৃদু ও মমতা মাখানো স্বরে বললাম, ‘হ্যাঁ, তুমিই আমার বনলতা। আমার ভালোবাসার বনলতা সেন।’   g