সংস্কৃতি

কার্তিকের নগরকীর্তন

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৮, ২০:১৬

 

নগরকীর্তন বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি লোকায়ত সংস্কৃতি। আধুনিক ধ্যান-ধারণা, পাশ্চাত্য অপ-সংস্কৃতির করাল থাবা, কর্মব্যস্ততা ও প্রযুক্তির উত্কর্ষে আমাদের হাজার বছরের এই ধর্মীয় সংস্কৃতি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর স্মৃতিবিজড়িত পুণ্যভূমি সিলেট বিভাগের (অন্য বিভাগগুলোতে থাকলে থাকতেও পারে) বিভিন্ন অঞ্চলে ঢিলেঢালাভাবে শুধু নিয়ম রক্ষার জন্য এ ধর্মীয় সংস্কৃতি পালন করা হয়। নগর+কীর্তন = নগরকীর্তন পূর্বে নগর থেকে শুরু হলেও এখন তা গ্রাম-কীর্তনে পর্যবসিত হয়েছে। বাংলা কার্তিক মাসের ১ তারিখ থেকে কার্তিকসংক্রান্তি পর্যন্ত সারা মাসব্যাপী সন্ধ্যার পর শিশু-কিশোর, যুবক, বৃদ্ধসহ পুরুষ ভক্তবৃন্দ মৃদঙ্গ, কাঁসর, শঙ্খ, করতাল, বাঁশি, হারমোনিয়াম ইত্যাদি বাদ্যবাজনাসহ পাড়া-মহল্লা-গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধর্মীয় বিভিন্ন গানসহ কৃষ্ণ-নাম করাই নগরকীর্তন।

কীর্তন নিয়ে প্রত্যেক বাড়িতে আসার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে পূজামণ্ডপ বা দেব মন্দিরের সামনের তুলসি গাছের বেদীতে মোম, আগরবাতি বা ধুপ ও দীপ জ্বালিয়ে দেন মহিলারা। আর সংকীর্তন বাড়িতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির বউ-ঝিয়েরা উলুধ্বনি (জয়ধ্বনি বা মঙ্গলধ্বনি) দিয়ে থাকেন। প্রত্যেক বাড়ির উঠোনে স্বাভাবিকভাবে ঘুরে ঘুরে (চক্কর দিয়ে, তবে ধামাইল নৃত্যের মতো নয়) নগরকীর্তন করা হয়। যখন ঝুম লেগে যায় অর্থাত্ সবাই যখন গান গাইতে গাইতে আধ্যাত্মিক চেতনায় আত্মহারা হন তখন সবাই বিশেষ ভঙ্গিমায় পুরুষালি নৃত্য শুরু করেন। প্রত্যেকটি গানের প্রায়  শেষের দিকে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। তখন বাজনা ও গানের কথা আরো উচ্চ শব্দে হয়। মহিলারা আবার উলুধ্বনি  করেন।

কার্তিক মাসের নগরকীর্তনে বাড়ি বাড়ি লুট দেওয়া একটি বিশেষ রীতি। প্রতিদিনই এক বা একাধিক বাড়িতে লুট থাকে। লুট মানে—নকুল, বাতাসা, কদমা, শুকনো সন্দেশ, মিষ্টি ইত্যাদি মিষ্টিদ্রব্য এবং কলা, আপেল, কমলা, নারিকেল ইত্যাদি ফল হরির (ভগবান) প্রসাদ হিসেবে ‘হরিবল হরিবল’ বলে ভক্তদের মাঝে ছিটিয়ে ছিটিয়ে বিতরণ করা। সবাই তখন প্রশস্ত আঙিনা থেকে লুট কুড়িয়ে খায়। রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়—কার আগে কে বা কার চেয়ে কে বেশি লুট কুড়াতে পারে। তবে হরির লুট থেকে যাতে কেউ বঞ্চিত না হয় সেজন্য কিছু প্রসাদ পিতল বা কাঁসার থালা বা বাটিতে রেখে দেওয়া হয়।