কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালীর বালুখালী বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দিতা করেছিলেন স্থানীয় মৃত ছিদ্দিক আহমেদের ছেলে বুজরুছ মিয়া। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন চোরাকারবারি ও বিভিন্ন মাদক মামলার আসামি হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ আলমগীর আলম। কালো টাকা ঢেলে নির্বাচনে জয় হাসিল করে সভাপতি হন তিনি।
বাজার কমিটির সভাপতির পাশাপাশি বালুখালী বাজার ইজারাদারের অংশীদারও মোহাম্মদ আলমগীর। এ দুই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সীমান্ত ঘেষা বালুখালী বাজার দিয়ে বিনা বাঁধায় প্রতিদিন অবৈধ মাদক আনতো তার সিন্ডিকেট।
কিন্তু সম্প্রতি বাজার ইজারদারের অংশ হয়ে টোল আদায়ের দায়িত্ব পান সভাপতি পদে হেরে যাওয়া বুজরুছ মিয়া। তিনি তার কর্মচারী মো. ইসমাঈলকে নিয়ে প্রতিদিন বাজার হতে টোলের টাকা উত্তোলন এবং রাতে বাজার পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছিলেন। এ সময় আগের নিয়মে আলমগীর সিন্ডিকেটের মাদকের চালান আসার পথে বুজরুছ মিয়া ও ইসমাঈলের নজরে পড়ে। তারা মাদক চোরাচালান পাচারে বাঁধা সৃষ্টি করায় তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে আলমগীরের সিন্ডিকেট সদস্য মো. মহিন, মো. মনির, আশিকুল আলম ওরফে আশিইক্কা। এর সূত্র ধরেই নিজেদের মাদক দিয়ে ভুল তথ্যে বুজরুছ মিয়া ও তার কর্মচারী ইসমাঈলকে বিজিবির কাছে ধরিয়ে দিয়েছে চার মাদক কারবারি সিন্ডিকেট।
বৃহস্পতিবার (১১ মে) রাতে কক্সবাজার শহরের এক রেস্তোরাঁর হলরুমে সংবাদ সম্মেলন করে এসব কথা তুলে ধরেন কারান্তরীণ বুজরুছ মিয়ার স্ত্রী মিনুয়ারা বেগম। গত ২৬ এপ্রিল ২১ কেজি আইসসহ বুজরুছ মিয়া ও ইসমাঈলকে বিজিবি আটক করে বলে প্রচার করে। তবে, বিজিবির সংবাদ সম্মেলনেও বুজরুছ-ইসমাঈল দাবি করেছিল তাদেরকে বাড়ি থেকে ধরে আনা হয়েছে এবং এসব মাদকের বিষয়ে তারা কিছুই জানে না।
বৃহস্পতিবার রাতের সংবাদ সম্মেলনে মিনুয়ারা বেগম আরও বলেন, বিজিবি দেশের সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে মাদক রোধ ও সীমান্ত রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। মাদক চালানের সংবাদ পেলে তারা কালবিলম্ব না করে অভিযান চালায়। সরকারি এ বাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। তারা হয়তো ভুল তথ্যে আমার স্বামী ও কর্মচারী ভাগিনাকে মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রচার করেছে।
তিনি বলেন, মূল বিষয় হলো এলাকার মহিন, আলমগীর আলম, মনির ও আশিইক্কা বালুখালীর চিহ্নিত চোরাকারবারী সিন্ডিকেট। তারা বিভিন্ন বাহিনীর সোর্স হিসেবেও পরিচিত। তারা বালুখালী ক্যাম্পের ভেতরের রাস্তা দিয়ে মাদকসহ অবৈধ পণ্যের চালান নিয়ে যায়। ক্যাম্পের ভেতর আমাদের মালিকানাধীন কিছু জমিতে মুক্তি কক্সবাজার ও ব্রাক এনজিওর লার্নিং সেন্টার ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এর পাশেই আমাদের খামারবাড়ি। আমার স্বামী বুজরুছ মিয়া খামার বাড়ির পাশাপাশি এনজিওর লার্নিং সেন্টারগুলোও পাহারার দ্বায়িত্ব পালন করতেন। ১৯ এপ্রিল রাতে আলমগীর সিন্ডিকেট কয়েকজন রোহিঙ্গার মাধ্যমে মাদকের চালান আনছিলেন। খামার বাড়ি পার হবার সময় তাদের বাঁধা দেন আমার স্বামী বুজরুছ। খবর পেয়ে সেখানে এসে সিন্ডিকেট সদস্য মহিন ও আলমগীর আলম, আমার স্বামীকে দেখিয়ে নেওয়ার হুমকি দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২৬ এপ্রিল রাতে এক পরিত্যক্ত ঝুপড়িতে মাদকের চালান রেখে তা আমার স্বামীর বলে বিজিবিকে ভুল তথ্য দেয় আলমগীর সিন্ডিকেট। বিজিবি ক্যাম্পের বাইরের ওই ঘরে মাদক পেয়ে ক্যাম্পের ভিতর থেকে আমার স্বামী বুজরুছমিয়া ও কর্মচারী ইসমাঈলকে নিয়ে আসে। তাদের আনার ভিডিও ফুটেজ ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভে ধারণ করা আছে। ক্যাম্প- ৯ এর খামারবাড়ি থেকে আমার স্বামী এবং কর্মচারীকে ধরে নিয়ে আসার সময় বিজিবির গাড়িতে বা আমার স্বামী এবং কর্মচারীর সঙ্গে কোনো ধরণের মাদক ছিল না। ওইদিন রাতে ক্যাম্প- ৯ এর খেলার মাঠ পয়েন্টে দায়িত্বরত এপিবিএন সদস্যরাও তা দেখেছেন। কিন্তু দিনের বেলা বিজিবি সংবাদ সম্মেলন করে প্রচার করে আমার স্বামী ও কর্মচারীসহ তিনজনকে বিপুল পরিমাণ (ক্রিস্টাল মেথ) আইসসহ সীমান্ত থেকে ধরেছে। আমি হলফ করে বলছি বিজিবি কর্তৃক জব্দকৃত মাদকগুলো আমার স্বামীর নয়।
মিনুয়ারা বেগম বলেন, সীমান্ত অধিবাসী হিসেবে পূর্ব থেকে আমার পরিবার বিজিবি সদস্যদের সব সময় সহযোগীতা করে আসছে। আমাদের পুরোনো ভিটার পাহাড়ে বসে বিজিবি টহল দল সীমান্ত পাহারা দিতেন। আমার স্বামীকে ফাঁসানোর পেছনে বিজিবির কোনো দোষ নেই। নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে সোর্স পরিচয়দানকারী ও বিভিন্ন মাদক মামলার আসামী আলমগীর আলম সিন্ডিকেট আমার স্বামীকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে।
তিনি দাবি করেন, মাদক কারবারিদের অর্থবিত্ত ও চালচলনে কিছু না কিছু প্রকাশ পায়। প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ আমাদের সহায় সম্পদ ও অর্থবিত্ত সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে গোপনে খতিয়ে দেখুন। মাদকের টাকা থাকলে বেতনে টোল আদায়কারীর চাকরি ও নাইটগার্ডের কাজ করতো না আমার স্বামী। নিরপেক্ষ তদন্ত টিম গঠন করে ঘটনাটি তদন্ত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর আবেদন জানান তিনি। ২১ কেজি আইসের মালিক কারা তা বের করে আসল কারবারি যেন ধরা পড়েন এটাই সাধারণ স্থানীয়দের চাওয়া।
২০১৭ সালের রোহিঙ্গার ঢলের পর কিছু স্থানীয় ও রোহিঙ্গা মিলে সাধারণ মানুষের জীবন দূর্বিসহ করছে। তারা বিভিন্ন সংস্থার সোর্স পরিচয়ে মাদককারবার করছে আর যারা তাদের বাঁধা দেয় তারাই হয়রানির শিকার হন। আমার স্বামী ও ভাগিনাকে কারান্তরীণ করার পর ঐ সিন্ডিকেট আমাদের নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলছে। আমাদের বড় ছেলে জোবাইরুলকেও মাদক দিয়ে প্রশাসনের কাছে তুলে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, যা মোবাইলে রের্কড করা আছে- আরও যোগ করেন মিনুয়ারা।
সংবাদ সম্মেলনে ইসমাঈলের স্ত্রী ইয়াসমিন আকতার, ইসমাঈলের মা মেহেরুন্নেসা, বাবা আবদু শুক্কুরসহ দুই পরিবারের ১৫-২০ জন সদস্য নারী-শিশু ও পুরুষ উপস্থিত ছিলেন।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে বালুখালী বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি আলমগীর আলমের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরটি সকাল হতে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে চেষ্টা করেও সংযোগ পায়নি।
