বিচারপ্রার্থীদের কাছে আস্থার নামে পরিণত হয়েছে মাদারীপুরের এডিএম কোর্ট 

আপডেট : ১৪ মে ২০২৩, ২৩:২৫

পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে মাদারীপুর জেলার জমির মূল্য বেড়ে যাওয়া এ জেলার জনগণের একটা বড় অংশ প্রবাসে থাকাসহ বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে বেশ ক'বছর ধরে জমি নিয়ে বিরোধের মাত্রা বেশ বেড়ে যায়। মাসের পর মাস এমন কি বছরের পর বছর ধরে বিচারপ্রার্থীদের আদালতের বারান্দায় ঘুরতে দেখা গিয়েছে। একক দায়িত্ব হিসেবে একজন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় অনেক সময়ই এ আদালতের মামলাজট বাড়তে থাকে। তবে আদালত এলাকা পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপকালে জানা যায় বর্তমান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পল্লব কুমার হাজরা দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকেই আদালতের চিরায়ত স্থবিরতা উধাও হতে শুরু করেছে। জনমনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেখা যাচ্ছে।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মূলত জমিজমার দখল সংক্রান্ত দ্রুত বিচার পাবার জন্য মামলা রুজু করা হয়ে থাকে। একটি মামলা দায়েরের পর সে বিষয়ে দখল সংক্রান্ত প্রতিবেদন, শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য স্থানীয় থানাকে নির্দেশনা প্রদান, বিবাদীর জবাব দান এবং সর্বোপরি এ সকল বিষয়ে আদালতে শুনানি গ্রহণের জন্য একাধিক তারিখে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।  বিগত পাঁচ মাসে নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা যার অবস্থান ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলার নিষ্পত্তির হারের মধ্যে বেশ উপরের দিকে। 

এ আদালতের বিচারপ্রার্থী এক ব্যক্তি সাথে কথা হলে তিনি বলেন,  সম্পত্তি অবৈধভাবে দখলের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মামলা দায়ের করেছিলাম। তখন থেকে বার বার তারিখ নির্ধারণ করা হলেও তিনি চূড়ান্ত রায় পাননি। বর্তমান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করে অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করে দেন। তিনি বর্তমানে বিবাদীপক্ষের অপশক্তির হাত থেকে মুক্ত বলে জানান।

অপরদিকে একজন আইনজীবী জানান, তার একজন মক্কেল যিনি মামলার বিবাদী তাকে হয়রানি করার জন্য এক ব্যক্তি ২০১৭ সালে মামলা দায়ের করেন। এরপর থেকে বিভিন্ন অজুহাতে বাদীপক্ষ আদালতে সময়ের আবেদন করেন এবং বিজ্ঞ আদালত তা ধারাবাহিকভাবে মঞ্জুর করেন। এতে করে নালিশী ভূমিতে শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের আশংকা না থাকলেও আমার নিরপরাধ মক্কেল দিনের পর দিন আদালতের বারান্দায় ঘুরে ঘুরে হয়রানির শিকার হোন। এ বিষয়টি বিজ্ঞ এডিএম স্যারের দৃষ্টিগোচরে আসার পর তিনি পর্যালোচনান্তে বাদীকে জেরা করে মামলা পরিচালনার হেতু না থাকায় খারিজ করে দেন। এতে করে আমার মক্কেল দীর্ঘ প্রায় ছয় বছরের মিথ্যা মামলার যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ পান। আরও বেশকয়েকজন ভুক্তভোগীর সাথে কথা বলে এমন অভিব্যক্তিই জানা গিয়েছে। 

আদালতের বেশ কয়েকজন আইনজীবী জানান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শতভাগ নিরপেক্ষতার সাথে "অন মেরিট" মামলার রায় প্রদান করেন। তিনি ভুক্তভোগী বাদী বিবাদীদের কথা, বিজ্ঞ কৌসুলিদের যুক্তিতর্ক এবং দখল প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে রায় প্রদান করেন। তিনি হাসিমুখে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে সময়ানুবর্তিতা বজায় রেখে মামলা পরিচালনা করার কারণে আদালতের সুনাম ও আস্থার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ বিষয়ে আরও জানতে কথা হয় কালকিনি উপজেলা  সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. কায়েসুর রহমানের সাথে। তিনি বলেন, এডিএম স্যার আমাদের বারবার বলে থাকেন আমরা যেন সরেজমিনে তদন্ত করে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে দ্রুততম সময়ে প্রতিবেদন প্রেরণ করি। আমরা সকল এসিল্যান্ড স্যারের এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে আন্তরিক থাকি। তিনি একটি বিষয় যোগ করে বলেন, কোন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরণে বিলম্ব হলে এডিএম স্যার এজলাসে বসে প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য আমাদের ফোন করেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে হোয়াটসঅ্যাপেও সংশ্লিষ্ট আদেশের কপি পাঠিয়ে থাকেন। এতে করে আমরা তার জুনিয়র কলিগরা অনুপ্রাণিত হই এবং শত ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিবেদন প্রেরণ করে থাকি। স্যারের ডিজিটাল মাধ্যমের শুভ ব্যবহার প্রশংসনীয় বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। জনদুর্ভোগ নিরসনে দ্রুততম সময়ে সঠিক প্রতিকার পেয়ে কালকিনি উপজেলার অনেকেই বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্যারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

জানা যায়, বর্তমান এডিএম তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরণে বিলম্ব হলে কিংবা কোন প্রতিবেদনে গরমিল পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে থাকেন। এতে করে বর্তমানে অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত ও নির্ভুলভাবে প্রেরণ করা হচ্ছে। একই তপশীল ও চৌহদ্দি নিয়ে বারবার মামলা দায়ের নিরুৎসাহিত করা, তদন্ত প্রতিবেদন প্রতিকূলে গেলে মামলা প্রত্যাহারের প্রবণতা হ্রাস করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে জনগণ অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানি থেকে মুক্তি পাচ্ছেন। 

মাদারীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. এ্যাডভোকেট ওবাইদুর রহমান খান বলেন, এডিএম কোর্টের মামলা সাধারণত দায়ের করা হয় জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা অবস্থাকে সমুন্নত রাখার জন্য। এক্ষেত্রে মামলায় দীর্ঘসূত্রিতা হলে মামলার মূল স্পিরিট হারিয়ে যায়। এক্ষেত্রে বিগত কয়েকমাস ধরে এডিএম কোর্টের মামলা নিষ্পত্তির হার বেড়েছে। একইসাথে, বিচারপ্রার্থীসহ আইনজীবীদের মধ্যেও বর্তমান এডিএম সম্পর্কে একটা উচ্চ ধারণা তৈরি হয়েছে। আমরা যারা সিনিয়র আইনজীবী আছি তারা একটা সময় দেওয়ানি আদালতে মনোনিবেশ করলেও এডিএম পল্লব কুমার হাজরার আচরণ, বিচার পরিচালনার প্রজ্ঞা, সময়নিষ্ঠতার জন্য এডিএম কোর্টেও নিয়মিত শুনানিতে অংশগ্রহণ করি। এমন প্রাজ্ঞ বিচারক তার আদালত তথা সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন বলে আমি বিশ্বাস করি।

সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হয় এডিএম পল্লব কুমার হাজরার সাথে। তার ভাষায়, "আমি আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনকে একটা বড় সৌভাগ্য হিসেবে দেখি। ভুক্তভোগীদের জায়গায় আমি আমার বাবা, ভাই অথবা কোন আপনজনকে কল্পনা করি।

এ বিষয়ে সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন জানান, পল্লব কুমার হাজরার মধ্যে আদালত পরিচালনার ক্ষেত্রে আলাদা মমত্ববোধ দেখেছি। তিনি প্রশাসনিক ব্যস্ততা কিংবা শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তার বিচারকাজ চালিয়ে গিয়েছেন এবং সঠিকভাবেই সকল মামলার রায় প্রদান করেছেন। আমি দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে তার মামলা পরিচালনা ও নিষ্পত্তির বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সভাও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। এতে করে জনগণ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জেলা প্রশাসন সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা তৈরি হয়েছে যা আমাদের সামগ্রিক কাজের মান ও গতি বাড়িয়ে দেয়।

কথা হয় বর্তমান জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মারুফুর রশিদ খানের সাথে। তিনি বলেন বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ জেলা প্রশাসনের সকল এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটবৃন্দ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে বিচারকার্য পরিচালনা করছেন। ফলে, মানুষ দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার পাচ্ছে। গত মাসেও ঢাকা বিভাগের মধ্যে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা নিস্পত্তিতে মাদারীপুর জেলা প্রথম স্থান অধিকার করে। এছাড়াও, ই-কোর্ট নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে এটি নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।

ইত্তেফাক/ইআ