অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের ক্ষতিগ্রস্তরা তিন দিনেও মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে পারেনি। সৌর প্যানেল নষ্ট ও লাইনের তার ছিঁড়ে যাওয়ায় চালু করা যায়নি বিদ্যুৎ সংযোগ। দ্বীপের উত্তর ও পশ্চিমাংশের বিচ এলাকায় খাবার পানির সংকট শুরু হয়েছে। এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ এসে পৌঁছায়নি দ্বীপে। বিধ্বস্ত বাড়িঘরের বাসিন্দারা খোলা আকাশের নিচে ত্রিপল টানিয়ে কোনো রকমে দিন কাটাচ্ছেন। প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া আর কোনো সেবা মিলছে না ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
একইভাবে উপজেলার আরেক উপকূলীয় ইউনিয়ন সাবরাংয়ের শাহপরীর দ্বীপের তিনটি ওয়ার্ডের ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো মানুষেরও একই অবস্থা। তার ছেঁড়ায় এবং ২০টির বেশি বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে যাওয়ায় তিন দিনেও বৈদ্যুতিক সংযোগ চালু হয়নি এখানেও। উপড়ে যাওয়া গাছগুলো সরানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন দুর্গতরা। স্থল যোগাযোগ সহজতর হওয়ায় এনজিও সংস্থাগুলো এগিয়ে এসেছে। ফলে এখানে খাদ্য সংকট নিয়ে কারো অভিযোগ নেই। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতায় টেকনাফের হোয়াইক্যং মিনাবাজার এলাকায় সদ্য তৈরি মুজিববর্ষের বেশ কয়েকটি ঘরও বিধ্বস্ত হয়েছে। বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলো আবার দাঁড় করাতে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন দুর্গতরা। জেলা প্রশাসন বলছে, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ দ্রুত শেষ করে সহযোগিতা দেওয়া হবে।
তথ্যমতে, গত ১৪ মে ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ কক্সবাজার অতিক্রম করে মিয়ানমারের সিটওয়ে এলাকায় আঘাত হানে। বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রমকালে টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ এবং একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে তাণ্ডব চালায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় দেড় হাজার পরিবার। কিন্তু তিন দিন অতিবাহিত হলেও পর্যাপ্ত সহযোগিতা দ্বীপে পৌঁছেনি বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। তবে কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাদ্দাম হোসনে বলেন, মোখায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো ত্রিপল দিয়ে কোনোরকম আশ্রয় তৈরি করেছে। অনেকে ঘরের ওপর ভেঙে পড়া গাছ সরিয়ে নিজেরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। এখনো সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ত্রাণ দ্বীপে এসে পৌঁছেনি। তবে শুকনো খাবার দিয়ে অনেক সংস্থা সহযোগিতা করছে। তিনি আরো বলেন, দ্বীপের বিচ এলাকার পাশের গ্রামগুলোতে খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ টিউবওয়েলে লবণাক্ততা দেখা দিয়েছে। সরকারি চিকিৎসকরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে না থাকায় প্রাথমিক সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে দ্বীপবাসীকে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান বলেন, জেলা প্রশাসন, কোস্ট গার্ড, বিজিবি এবং নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে শুকনো খাবার দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত বিধ্বস্ত এবং আংশিক মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা করা হয়েছে। তাদের জন্য ঢেউটিন সরবরাহ করছে জেলা প্রশাসন। আজকালের মধ্যে এসব নির্মাণ সামগ্রী সেন্টমার্টিন পৌঁছবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন থাকার কথা স্বীকার করলেও পানি সংকটের কথা অস্বীকার করেছেন চেয়ারম্যান।
জেলা প্রশাসনের গড়া কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিভীষণ কান্তি দাশ বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এখনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা এসে পৌঁছায়নি। এরপরও সেন্টমার্টিনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৪০০ বান ঢেউটিন, ঘরপ্রতি ৩ হাজার নগদ টাকা বিতরণ করতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবারের দিকে তা দ্বীপে পৌঁছে যাবে বলে আশা করা যায়। দুর্গতদের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের সংস্থান করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে সহযোগিতা দেওয়া হবে।
সেন্টমার্টিনে বিজিবি :ঘূর্ণিঝড় মোখায় ক্ষতিগ্রস্ত সেন্টমার্টিন দ্বীপ পরিদর্শন করে দুর্গতদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবির) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ কে এম নাজমুল হাসান। গতকাল মঙ্গলবার সকালে টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়নের সেন্টমার্টিন বিওপির সহাতায় ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৮০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন তিনি। এ সময় বিজিবির সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, কক্সবাজার রিজিওন কমান্ডার, টেকনাফ ব্যাটালিয়ন অধিনায়কসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম।
সেন্টমার্টিন দ্বীপে নৌবাহিনী : সেন্টমার্টিন দ্বীপে মানবিক সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। গতকাল মঙ্গলবার দ্বীপের ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের মধ্যে চিকিৎসা, ওষুধ সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে চাল, ডাল, আটা, ছোলা, লবণ ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন সামগ্রী প্রদান করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সহায়তায় মেডিক্যাল টিম গঠন করে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত রয়েছে। পরিস্থিতি উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত নৌবাহিনীর এ সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন নৌবাহিনীর সহকারী পরিচালক সাইদা তাফসী রাবেয়া লোপা।
