গত এক দশকে বাংলাদেশের রিটেইল ইন্ডাস্ট্রি বৃদ্ধির পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের দ্বারা উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক আমূল পরিবর্তন এনেছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নে এক বিশাল ভূমিকা পালন করছে।
গত এক দশকে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একটি যার গড় বৃদ্ধির হার ৬.৩% এর বেশি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশ ৪৬১ বিলিয়ন ডলার জিডিপি নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে ৩৫তম অবস্থানে রয়েছে। আইএমএফ'র তৈরি এই তালিকায় বিশ্বের ৫০টি বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়া দেশগুলোর মধ্যে শুধু ভারত ও বাংলাদেশ রয়েছে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রিটেইল বিজনেস দ্রুত পরিবর্তন ও বিকাশ লাভ করছে। পোশাক শিল্পের মতো রিটেইল সেলস সম্পর্কিত ইন্ডাস্ট্রিও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অন্যতম একটি সর্বাধিক বিকাশমান খাত হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে।
এমতাবস্থায় রিটেইল বিজনেসের ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল এবং রিটেইল সেলস চ্যানেলকে অটোমেশন করার মাধ্যমে রিটেইল ইন্ডাস্ট্রির উন্নতির গতিকে আরও বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে। নানাবিধ অটোমেশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে খুব সহজেই সেকেন্ডারি সেলস চ্যানেলকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আশা সম্ভব।
একটি উৎকৃষ্ট ডিস্ট্রিবিউশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম আপনার রিটেইল সেলস চ্যানেলে নিন্মোক্ত ফলাফলগুলো খুব দ্রুত প্রদান করতে পারে, যেমন: আপনার মাঠপর্যায় কর্মীদের সকল এক্টিভিটি ট্র্যাক করে নিমিষেই; আপনার SR এর দৈনিক প্ল্যান vs ভিসিট রিপোর্ট নির্মাণ করে নিমিষেই; আপনার সেলস চ্যানেলের মার্কেট কাভারেজ খুব অল্প সময়ে বৃদ্ধি করে; আপনার সেলস চ্যানেলের ইফেক্টিভ আউটলেট কাভারেজ বৃদ্ধি করে; এটি আপনাকে মাঠপর্যায় থেকে রিয়েল টাইম (যে কোনো সময়ের) রিপোর্ট তৈরি করে; সলুশনটি আপনার বিসনেস এফিসিয়েন্সি এবং প্রোডাক্টিভিটি লক্ষণীয় মাত্রায় বৃদ্ধি করে।
পাশাপাশি আপনার সেলস টিমের দক্ষতা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করে এবং আপনার ব্যবসায়ের লাভ বৃদ্ধিতেও সরাসরি ভূমিকা রাখে একটি উন্নতমানের ডিস্ট্রিবিউশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি স্মার্ট সেলস অটোমেশন সফটওয়্যারে নিন্মোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা খুবই জরুরি।
লাইভ ড্যাশবোর্ড এবং রিয়েল টাইম রিপোর্টিং:
বিক্রয়কর্মীদের প্রতিমুহূর্তের রিয়েল টাইম বিক্রয় তথ্য দেখায়। তাদের সেলস টার্গেট, এচিভমেন্ট, ইনভয়েসের সংখ্যাসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এই ড্যাশবোর্ড প্রদান করে থাকে। এছাড়া মাঠ পর্যায় থেকে পাঠানো তথ্য একেবারে রিয়েল টাইমে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়ে যাবে ম্যানেজমেন্ট রিপোর্টিং এর জন্যে।
অর্ডার কালেকশন ও ম্যানেজমেন্ট:
প্রতিদিনের অর্ডার কালেকশনের তথ্য মাঠপর্যায় থেকে সরাসরি সংগ্রহ করে ও সেগুলোকে যথাযথভাবে ডেলিভারির জন্য সঠিক ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে পৌঁছে দেয়। এর মাধ্যমে প্রতিটি পণ্যের দাম ও পরিমাণ অনুযায়ী নির্ভুলভাবে ইনভয়েস তৈরি হয়ে যায় যা আপনার সেলস চ্যানেলে থাকা প্রতিটি দোকান সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা তৈরি করার এবং নির্দিষ্ট দোকান বা বাজার নিয়ে পরিকল্পনা করার আরও বেশি সুযোগ তৈরি করে দেয়।
বিক্রয়কর্মীদের ট্র্যাকিং এবং রুট প্ল্যানিং:
জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিক্রয়কর্মীরা কখন কোন সেলস পয়েন্ট/মার্কেট ভিসিট করছেন তার তাৎক্ষণিক খবর পৌঁছে দেয় এবং তাদের দৈনিক রুট প্ল্যানিং এ সহায়তা করে।
ডেলিভারি ও পেমেন্ট আপডেট:
প্রোডাক্ট ডেলিভারি ও পেমেন্ট হওয়ার সাথে সাথে অনলাইনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট করে, যা আপনাকে প্রতিটি দোকান, এলাকা ও বিক্রয়কর্মীর বকেয়া কালেকশনের পারফর্মেন্স সম্পর্কে কাজ করার পরিষ্কার ধারণা দিয়ে থাকে।
ইনভেন্টরি ও ওয়্যারহাউস স্টক ম্যানেজমেন্ট:
এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে আপনি ডিস্ট্রিবিউটরের স্টকের সঠিক হিসাব একেবারে সঠিকভাবে মনিটরিং করতে পারেন।
মার্কেট সার্ভে ও বিজনেস ইন্টেলিজেন্স কালেকশন:
এই সফটওয়্যার আপনাকে মার্কেট থেকে ক্রেতা ও প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে সরাসরি আপনার কাছে রিপোর্ট আকারে পাঠিয়ে আপনাকে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ও জনপ্রিয় সেলস অটোমেশন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান সক্রিয় টেকনোলজিস-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুবির চৌধুরী বলেন, সক্রিয় ডিএমএস সফটওয়্যারটি একটি রিটেইল ব্যবসা সামলানোর ঝামেলা কমানোর পাশাপাশি আপনার সেলস চ্যানেলের দক্ষতা বাড়িয়ে প্রতি ১০০ জনের সেলস টিমে ৩৮ জন বিক্রয়কর্মীর সারা বছরের স্যালারির সমপরিমাণ টাকা বাঁচাতে সক্ষম। সফটওয়্যার চালানোর যাবতীয় খরচ বাদ দেওয়ার পরেও একটি ১০০ জনের দলে যার পরিমাণ হতে পারে বছরে ৬৯ লাখ টাকা পর্যন্ত।
মুবির চৌধুরী বলেন, সক্রিয় ডিএমএস একটি ব্যবসায়ে বিভিন্ন উপায়ে খরচ কমায় এবং জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধি করে। কাগজপত্রের ব্যবহার শতভাগ পর্যন্ত হ্রাস, অটোমেশনের মাধ্যমে দ্রুত রিয়েল টাইম অর্ডার প্রসেসিং নিশ্চিতকরণ এবং প্রোডাক্ট ডেলিভারির সময় কমানো, মাঠ পর্যায় এবং হেড অফিস রিপোর্টিং-এর সময় ও খরচ সাশ্রয় ছাড়াও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন মতো অন্যান্য সফটওয়্যারের সঙ্গে ইন্টেগ্রেশনের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমকে লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করে মূল সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করে।
ইতিমধ্যে ৩০টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের ৬৪টি জেলাতে তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় সক্রিয় ডিএমএস ব্যবহার করছে এবং আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান খুব তাড়াতাড়ি এই সফটওয়্যারের আওতায় আসবে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধিদের প্রতিদিনের শিডিউলড আউটলেট ভিসিট ৭৯% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মার্কেট এক্টিভিটি টাইম ও ফেসটাইম (দোকানে ব্যয় করা সময়) ৩০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে তারা একটি বিশেষ মার্কেটে ২০% পর্যন্ত বিক্রয় বৃদ্ধি করতে সমর্থ হয়েছেন, যার মূলে রয়েছে সক্রিয় ডিএমএস সফটওয়্যারের যথাযথ ব্যবহার।
এছাড়াও তাদের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানেগুলোর সেলসটিম কালচার ডেভেলপমেন্টে এই সক্রিয় ডিএমএস বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে বলেও তিনি জানান। পরিষ্কারভাবে বিক্রয়কর্মীদের কাজের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও তা পুঙ্খানুপুঙ্খ মনিটরিং-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে একটি পারফরম্যান্স ওরিয়েন্টেড কালচার গড়ে তোলা যাচ্ছে। সাধারণত এই সফটওয়্যারটি সফলভাবে ইমপ্লিমেন্ট করার মাসখানেকের মধ্যেই এই ফলাফল ভিত্তিক সংষ্কৃতি দৃশ্যমান হওয়া শুরু করে এবং তা অন্যান্য অনুৎপাদনশীল পলিটিক্সকে দূরে সরিয়ে দেয়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ৩০টি প্রতিষ্ঠানের ২০০০ বিক্রয়কর্মী এই সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রতি মাসে প্রায় দশ লক্ষ দোকানের ভিজিট রিপোর্ট তৈরি করছেন। এই সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রতি মাসে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা মূল্যমানের ৭ লক্ষ ইনভয়েস করা হয়। এই বিশাল কার্যক্রম অনেক সহজে পরিচালনার কাজে প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় ডিএমএস ব্যবহার করছে। সহজে কাজের হিসাব নেওয়া ও বিভিন্ন এনালিটিক্যাল রিপোর্ট পাবার কারণে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট এমন অনেক সিদ্ধান্ত খুব দ্রুত নিতে পারছেন যা নেয়ার কথা আগে চিন্তাও করতে পারতেন না।
