বাংলার আপেলের ভাসমান বাজার

আপডেট : ২৩ জুন ২০১৯, ১৭:৪৫

বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি

পলাশ রায়

 

বরিশাল, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে এই সময়ে চাষ হয় বাংলার আপেল খ্যাত পেয়ারা। আর সেসব পেয়ারা বিক্রি হয় নৌকাতেই। প্রকৃতির নৈসর্গিক পরিবেশে বসে এই ভাসমান হাট-বাজার। আর এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে প্রতিবছরই হাজারো পর্যটক ভিড় জমান ঝালকাঠির ভিমরুলি গ্রামে। দৃষ্টিনন্দন এ পেয়ারা হাটকে থ্যাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেট কিংবা কেরেলার ব্যাকওয়াটার ট্রিপের সাথে তুলনা করেন অনেকেই।

ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শেখ আবু বকর সিদ্দিক জানান, ঝালকাঠি সদর উপজেলার ২০টি গ্রামে ৫০০ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। শতবছর ধরে বংশানুক্রমে এখানকার হাজার হাজার মানুষ কান্দি বা সজ্জন পদ্ধতিতে পেয়ারা চাষ করছেন। বছরের প্রায় ১২ মাসই এ অঞ্চলটি পানি বেষ্টিত থাকে। শ্রাবণ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত এসব গ্রামে ভাসমান হাটে পেয়ারা বেচাকেনা চলে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসব হাট থেকে পেয়ারা কিনে নিয়ে যান।

ভাসমান হাটগুলোর মধ্যে ঝালকাঠি সদর উপজলোর কীর্তিপাশা ইউনিয়নের ভিমরুলি গ্রামের ভিমরুলি খালের ওপরের ভাসমান হাটটি সবচেয়ে বড়। পেয়ারা ছাড়াও ১২ মাস ভাসমান এ হাটে কেনাবেচা হয় স্থানীয় কৃষকদের উত্পাদিত অন্যান্য কৃষি পণ্য। আর এ সময় ক্রেতা-বিক্রেতা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো পর্যটক আসেন ভাসমান বাজারের মনোরম দৃশ্য দেখতে। আসেন বিদেশিরাও।

কুড়িয়ানা থেকে ভিমরুলির পথে যাওয়ার সময় চোখে পড়বে অসংখ্য পেয়ারার বাগান। নৌকাতে অবস্থান করেই পেয়ারা সংগ্রহ করেন কৃষকরা। নৌকা থামিয়ে ঢুকে যেতে পারেন বাগানের ভেতরেও। ঢুকলেই দেখবেন ছোট নালার দু-পাশে গাছ ভর্তি পেয়ারা। সেখানকার কৃষকরা আপনাকে দেখে বলতে ভুলবে না, ‘দাদা ইচ্ছে মতো নিজহাতে পেয়ারা পেড়ে খান!’

এরইমধ্যে টুকটাক বাজার মিললেও জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকেই জমে উঠবে। তখনই ভিড় জমবে পর্যটকদের। গতবছর এখানে আসা বেশ কয়েকজন পর্যটক বলেন, ‘এত বছর পেরিয়ে গেলেও এখানে এখনো তৈরি হয়নি পর্যটকদের জন্য কোনো বিশ্রামাগার। খাবারের জন্য নেই কোনো ভালো হোটেল কিংবা রেস্তোরাঁ। তাই এখানে আসতে আসতেই ফিরে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করতে হয়।’

এখানের পেয়ারা বাগান মহান মুক্তিযুদ্ধের শোক আর গর্বের স্মৃতি বহন করে আসছে। একাত্তরের ৯ মাস ঝালকাঠি জেলার বিভিন্ন স্থানে পাকবাহিনী নির্মম গণহত্যা চলায়। এরমধ্যে ঝালকাঠি সদর উপজেলার পেয়ারা বাগান এলাকার বিলাঞ্চলে নির্মম হত্যাযজ্ঞে শহীদ হন কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ। বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পেয়ারা বাগানে আশ্রয় নেওয়া অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এসব বিলাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে, হত্যা করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের। এ অঞ্চলে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল প্রতিরোধ ও দুর্গ গড়ে তোলেন। পেয়ারা ঘন অরণ্যে ছিল তাঁদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। সেইসাথে বরিশাল বিভাগের হাজার হাজার মানুষ এ বাগানে আশ্রয় নেয়। গ্রামের ভিমরুলি খালে পাকবাহিনীর সাথে সিরাজ সিকদারের বাহিনীর কয়েকটি যুদ্ধে পরাজিত হয় পাকবাহিনী। আর সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে ভিমরুলিসহ আশেপাশের গ্রামে পাকবাহিনী পরে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুট ও অগ্নিসংযোগ করে।

খাল-বিল আর নদী বেষ্টিত বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলায় বাংলাদেশের ভাসমান হাট বসছে ১২ মাস। এরমধ্যে ঝালকাঠি সদর উপজলোর ভিমরুলি গ্রামের এ ভাসমান হাটটি পর্যটনের এক বড় সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে বলে আগন্তুকদের অভিমত। এরইমধ্যে দেশের পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টিতেও পড়ছে ভিমরুলির ভাসমান এ হাটটি।

অসংখ্য নদী-নালা আর খাল-বিল বেষ্টিত জেলা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে ভাসমান হাট বসছে প্রাচীনকাল থেকেই। তবে থাইল্যান্ড কিংবা ভারতের কেরালার পর ব্যাকওয়াটার ট্যুরিজমে ঝালকাঠির ভিমরুলির হাটটি এখন পর্যটকদের নজর কাড়ছে।

 

জেনে রাখুন

ঢাকা থেকে রাতের লঞ্চে ভ্রমণ করে পরের দিন বেড়িয়ে আবার রাতের লঞ্চেই ফিরে আসা যায়। এ ভ্রমণের পুরোটাই জলপথে। সাঁতার জানা না থাকলে সঙ্গে লাইফ জ্যাকেট নেওয়া জরুরি।

ঢাকার সদরঘাট থেকে সন্ধ্যায় হুলারহাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায় রাজদূত-৭, অগ্রদূত প্লাস লঞ্চ। এ লঞ্চে চড়ে নামতে হবে বানারিপাড়া কিংবা স্বরূপকাঠি। সেখান থেকে ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করে যেতে হবে জায়গাগুলোতে। ঢাকা থেকে লঞ্চের দ্বৈত কেবিনের ভাড়া ২০০০ টাকা, একক কেবিন ১০০০ টাকা। বানারিপাড়া কিংবা স্বরূপকাঠি থেকে সারাদিনের জন্য একটি ইঞ্জিন নৌকার ভাড়া লাগবে ২৫০০ থেকে ৩০০ টাকা। এছাড়া ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে বরিশাল, সেখান থেকে বাসে বানারিপাড়া এসে জায়গাগুলোতে বেড়াতে পারেন। সারাদিন বেড়িয়ে আবার রাতের লঞ্চেই ফিরতে পারেন।