লটকে আছে লটকনের রাজ্য!

আপডেট : ২৩ জুন ২০১৯, ১৭:৪৬

     নরসিংদী

ফাহিম মোহাম্মদ

 

লটকে থাকা লটকন দেখতে গিয়ে ঠিক যেন ‘লটকন কাণ্ড’ দেখলাম! একসঙ্গে এত লটকন আর কখনো দেখা হয়নি। যেন ছোট ছোট হলুদ বল থরেথরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এমন সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মুখে ‘টক-মিষ্টি’ অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরেন অনেকেই। আমিও যুক্ত হলাম সেই দলে।

দাদার মুখে শুনেছিলাম, নরসিংদী এলাকার রায়পুরা ও শিবপুরে এক সময় প্রচুর কাঁঠাল চাষ হতো। কিন্তু গিয়ে দেখলাম এখন সে জায়গা দখল করেছে লটকন। এমনকি লটকনের উঠলেই বেশিরভাগ মানুষই বলেন, চলো লটকন দেখতে নরসিংদী যাই। আমাদের ভ্রমণ পরিকল্পনাটাও শুরু এভাবেই। এক আড্ডায় কে যেন বলে উঠলো নরসিংদীর কথা। ঢাকার খুব কাছে হওয়াতেই কম সময়ে যেতে পেরেছি। সবচেয়ে সুবিধা হলো, সেখানে আমার দুই বন্ধুর বাড়ি। তাঁরা বললো, ‘জুন থেকেই ঝুলছে লটকন। এসে পড়।’

খুব ভোরেই রওনা দিলাম নরসিংদীর উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে প্রায় ১১টা বাজলো। গাড়ি থেকে নামতেই এক অটোওয়ালা বললো, ‘বাজার বসে মরজাল এলাকায় ভোর ৫টায়। সেটা দেখলেও ভালো লাগতো। ভোরে এলে ভালো করতেন।’ তাঁর কথায় খানিকটা মন খারাপ হলেও আকাশের রঙ দেখে ভালো হয়ে গেল। বৃষ্টি নেই, আকাশ একদম পরিষ্কার। রোদও উঠেছে। পেঁজা তুলার মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে সে আকাশে। মেঘে ভেসে ভেসেই যেন আমরা লটকন বাগানে চলে এলাম। এখানে ‘ভিউ পয়েন্ট’ বলে কিছু নেই। দু- চোখ বিস্তৃত করলেই প্রাণ ভরে উপভোগ করা যাচ্ছে লটকনের সৌন্দর্য। আমরা লটকনের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ হলাম! সজাগ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম, একটা লটকন গাছও যেন মিস না হয়!

লটকনের হলুদ রঙে ছেয়ে আছে পুরো বাগান। এদিকে সূর্যের আলো আরো সোনালি করে তুলেছে পুরো পরিবেশ। যত দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি। গাছের শরীর বেয়ে, কাণ্ড বেয়ে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে, কোথায় নেই তাঁরা। একেবারে গোঁড়া থেকে শুরু করে চোখ যায় না এমন ওপর পর্যন্ত ধরে আছে অজস্র লটকন। মাটিতেও পড়ে আছে, দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন হলুদ গালিচা বিছিয়ে রেখেছে।

পুরো এলাকাই লটকনের দখলে। কাঁঠাল-লেবুও দেখা যায়, তবে কম। এসব নিয়ে কেউ ভাবেন না। সবার ভাবনা লটকন নিয়ে। ঠিক যেমন এখন আমাদের। ঘুরতে ঘুরতে পেয়ে গেলাম মনসুর নামের এক ব্যবসায়ীকে। তিনি দু-বছরের জন্য ইজারা নিয়েছেন বাগান। তিনি বলেন, ‘আ রে যা মন চায় খান। লটকন যত খাবেন কমবে না।’ আমরাও ইচ্ছেমতো খেলাম। ছবি তুললাম। এভাবেই ঘুরতে থাকলাম এক বাগান থেকে অন্য বাগান।

এক স্থানীয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বর্ষায় লটকন পাকা শুরু করে। তবে গাছে ফল আসে বৈশাখে, তখন এগুলোর রঙ থাকে সবজি। আকার আর গুণগত মান ভেদে এর দাম ভিন্ন। ১০ কেজির ঝুড়ির দাম ৫০০-১২০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

মৌসুমি ফসলের মধ্যে লটকন নিরাপদও বটে। কারণ লটকন বাজারজাত করতে ক্ষতিকর ফরমালিন ব্যবহার করা হয় না। ফলে সচেতন সব বয়সী মানুষের মধ্যে লটকনের চাহিদা বাড়ছে। তাই লটকনের বাজারজাত নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই চাষিদের। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বাগান থেকে লটকন কাঁচা অবস্থায় কিনে নেয়। পরে পাকলে পাইকারি বাজারে নিয়ে বিক্রি করে। মৌসুমি ব্যবসায়ী আবদুল হক বলেন, ‘৫ বছর ধরে আমরা ৪ জন মিলে লটকনের মৌসুমে বাগান কিনে ব্যবসা করছি। এবারো ৪ লাখ টাকায় ৩টি বাগান কিনেছি। তাতে ২ লাখ টাকা লাভের আশা করছি।’

আলমগীর হোসেন নামের একজন জানান, গ্রীষ্ম-বরষাকালই লটকন বাগান দেখার মোক্ষম সময়। সে হিসেবে লটকন বাগান বেড়ানোর এখনই শেষ সময়। এরপর লটকন আর থাকবে না এ বছরের মতো। সুতরাং একবার দলবেঁধে ঢুঁ মারতেই পারেন। সৃষ্টিগড় হয়ে চৈতন্য, কুণ্ডপাড়া, নৌকাঘাটা ও বেলাবোর লটকন বাগান মনের মতো ঘোরা যাবে।

 

জেনে নিন

ঢাকার সায়েদাবাদ, বনানী, মহাখালী বা উত্তরা থেকে যেকোনো নরসিংদীর বাসে উঠে পাঁচদোনা বাসস্ট্যান্ড নামতে হবে। সেখান থেকে সিএনজি ভাড়া করে যেতে হবে মরজাল। সিএনজির চালককে বললেই হবে যে লটকন বাগান দেখতে যাবেন, তিনিই আপনাকে কামারটেকের রাস্তা দিয়ে সৃষ্টিগড় পর্যন্ত নিয়ে যাবেন। এই ১৫ থেকে ১৬ কিলোমিটার সরু রাস্তার পুরোটাজুড়েই লটকন বাগান। ঢাকা থেকে নরসিংদীর পাঁচদোনা পর্যন্ত বাস ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ১০০ টাকা।