শিফারুল শেখ
ঊনবিংশ শতকে ফরাসি অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিক বাস্তিয়াত বলেছিলেন, এমন এক সময় আসবে যখন পণ্য সীমান্তের বাইরে যেতে পারবে না, কিন্তু সেনাবাহিনী সীমানা অতিক্রম করতে পারবে। বর্তমান পরিস্থিতি যেন সেই উক্তিকেই সত্য প্রমাণ করছে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি যে উন্নতিতে সহায়তা করে তা যেন ভুল প্রমাণিত করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। রাজনৈতিক বিশ্লেষক কেরি হুয়াংয়ের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বে শুল্ক যুদ্ধের নামে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ শুরু করেছেন। বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই অজুহাত তুলে তিনি তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়ন করতে উদ্যোগী হয়েছেন। যদিও কংগ্রেস মিত্রদেশগুলোকে ধৈর্য ধারণের আহবান জানিয়েছেন।
n চীনের সঙ্গে শুল্ক যুদ্ধ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ১০ মে চীন থেকে আরো প্রায় বিশ হাজার কোটি ডলারের আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার ঘোষণা দেন। এর পাল্টা চীন প্রায় ছয় হাজার ডলারের মার্কিন আমদানি পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বসায়। জুন মাসের ১ তারিখ হতে এই শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর আগে দুই দেশ পাল্টাপাল্টি পাঁচ হাজার কোটি ডলারের পণ্যে শুল্ক বাড়ায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তখন বলেন, তিনি চীনের বিরুদ্ধে এর পাল্টা আরো ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। যেসব পণ্যের ওপর এখনো শুল্ক বসানো হয়নি সেগুলোর ওপরও ২৫ শতাংশ শুল্ক বসাতে পারেন। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধে বছরে ৭৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবায় প্রভাব পড়বে। চীনের সঙ্গে যুদ্ধে চীনে গড়ে ওঠা অনেক মার্কিন কোম্পানি এখন পর্যন্ত লাভবান হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি এবং কম্পিউটার চিপসহ সফটওয়্যারের আধুনিকায়নে মার্কিন প্রযুক্তি দরকার চীনের। ট্রাম্প প্রশাসনের অনেকে মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যে চীনের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র অতি বাড়াবাড়ি করলে হিতে বিপরীতও হতে পারে।
n জাপান
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জাপানকে বাণিজ্যিক মিত্র এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু তার এই বক্তব্যও জাপানের ব্যবসায়ীদের মন থেকে শুল্কের হুমকি দূর করতে পারেনি। তিনি শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত করে বলেছেন, দুই দেশ ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারলে আবার শুল্ক বাড়ানো হবে। তিনি এজন্য জুলাইয়ে জাপানের নির্বাচন পর্যন্ত সময় দিয়েছেন। এদিকে চীনের অর্থনৈতিক ধীরগতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জাপান। কারণ বেইজিং জাপানের যন্ত্র এবং পণ্য আমদানিকারক দেশের মধ্যে অন্যতম প্রধান।
n মেক্সিকো
মেক্সিকো সীমান্তে শরণার্থীদের ঢল বন্ধ করতে সে দেশের উপর শাস্তিমূলক শুল্কের হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু এর ফলে আখেরে মার্কিন অর্থনীতির ক্ষতি হবে বলে সতর্ক করে দিচ্ছে তারই দল। মেক্সিকো এখন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। আইএইচএস মার্কিট গ্লোবাল ট্রেড অ্যাটলাসের তথ্যানুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য হয়েছে ১৫০ বিলিয়ন ডলার। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মেক্সিকোতে তৈরি গাড়ির ওপর শুল্ক বসানোর হুমকি দিয়েছেন। মেক্সিকোতে বেশিরভাগ গাড়ি কোম্পানির মালিক যুক্তরাষ্ট্রের এবং জাপানের নাগরিক।
n কানাডা
কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি করতে ঐকমত্যে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র। আগের নাফটা চুক্তি বাতিল করা হবে নতুন চুক্তির মাধ্যমে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চান, কানাডা তাদের ডেইরি পণ্য আমদানি করুক। কানাডা এখন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের লড়াইয়ের মাঝখানে পড়েছে। কানাডা চীনের বৃহত্ প্রযুক্তি কোম্পানি হুয়াওয়ের শীর্ষ নির্বাহী মেং ওয়াংঝৌকে গ্রেফতারের পর কূটনৈতিক সংঘাত বেড়েছে। চীন কানাডার দুই নাগরিককে গ্রেফতার করেছে। কানাডার কিছু কৃষি পণ্যেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বেইজিং।
n ইউরোপ
আমেরিকার প্রধান মিত্র ইউরোপের স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক বসান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বিদেশি গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক বসিয়েছেন। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মার্কিন অটোমোবাইল শিল্প ও জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। তিনি বিদেশি গাড়ি যেমন ইউরোপে তৈরি মার্সিডিজ বেঞ্চ এবং বিএমডাব্লিউর ওপর শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। হোয়াইট হাউস ইউরোপকে চুক্তি করতে ছয় মাস সময় দিয়েছে। ইতোমধ্যেই দেনদরবার চলছে। মার্কিন কৃষি পণ্য আমদানির সুযোগ না দিলে ছাড় দেবে না যুক্তরাষ্ট্র। ফ্রান্স এবং বেলজিয়াম বাদ সেধেছে। তারা বলছে, জলবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষর না করলে তারা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করবে না।
n ভারত
ভারতের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য সুবিধা তুলে নেওয়ায় ভারতের জুয়েলারি টেক্সটাইলস, ওয়াশিং মেশিন, গাড়ির যন্ত্রাংশ, কৃষি পণ্য এবং সৌর প্যানেল রপ্তানির ওপর এর প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালমন্ড, আপেল, ধাতব পণ্য আমদানির ওপর ২৪০ মিলিয়ন ডলারের শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ভারত। যদিও এর আগে বিভিন্ন সময় এ ধরনের শুল্ক বাস্তবায়ন স্থগিত করেছে ভারত। একইসঙ্গে ভারত নিত্যনৈমিত্তিক পণ্য, মেডিক্যাল যন্ত্রাংশ, অন্যান্য পণ্যের বাজারের ওপর মার্কিন চাপ কমানোর জন্য নীরবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে হার্লে ডেভিডসন মোটরসাইকেলের মতো প্রিমিয়াম পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে।
n একঘরে হবে যুক্তরাষ্ট্র!
সমালোচকদের মতে, বিতর্ক ছাড়া বেশিদিন স্বস্তিতে থাকতে পারেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বিশেষ করে তার আমেরিকা ফার্স্ট নীতির আওতায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক বিভ্রাটের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। চীন চারটি পদক্ষেপ নিতে পারে যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। প্রথমত, চীনে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে তোলা। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রকে একঘরে করে তোলা যা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। বাণ্যিজ্য নিয়ে আলোচনায় বসতে চলেছে ভারত, চীন ও রাশিয়া। ইউরোপ, এশিয়া আর ল্যাতিন আমেরিকার দেশগুলোর প্রতি মনোযোগ বাড়িয়ে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রকে একঘরে করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তৃতীয়ত, চীন যদি সরাসরি বাণিজ্যিক আক্রমণ করতে চায় তার জন্য সবচেয়ে সহজ হলো তাদের মুদ্রা ইউয়ানের মান কমিয়ে দেওয়া। এর দুটি সুবিধা আছে। এর ফলে চীনের রপ্তানি পণ্যের দাম কমবে এবং রপ্তানিকারকদের সুবিধা হবে। একই সঙ্গে সেটি আমেরিকান পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ১ দশমিক ১৭ ট্রিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ট্রেজারি বন্ড আছে চীনের কাছে। অনেক বিশ্লেষক ধারণা করেন, পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে চীন হয়তো এসব বন্ড ছেড়ে দিতে পারে। চীন যদি বড় আকারের বন্ড বিক্রির উদ্যোগ নেয়, সেটি আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলবে। হঠাত্ করে বেশি বন্ড বাজারে চলে এলে সেটির দাম পড়ে যাবে এবং তখন মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
