জয়নাল আবেদীন, গোপালপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা
টিনের ছাপড়ার চা দোকানের ভাঙা বেঞ্চটিতে গিয়ে বসলো রমেন্দ্র। বয়স ষাট ছুঁইছুঁই। হোটেল কর্মচারী কিশোর নুরু দেখেই দাঁত খিঁচিয়ে বললো, ‘আবার এসেছিস। তোকে না বলেছি, রাত দশটার পর আসতে।’ অগত্যা চা না পেয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায় রমেন্দ্র। এটি গত ১৭ জুন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ভেঙ্গুলা বাজারের চা দোকানের ঘটনা।
রমেন্দ্রর বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামগঞ্জে। পেশায় শূকর পালক। হিন্দু ধর্মের বর্ণাশ্রম অনুযায়ী জাতে নিম্নকায়স্থ। তবে নিজেরা দাবি করেন কায়পুত্র। কথা হয় রমেন্দ্রের সঙ্গে। দুমাস আগে শূকরের পাল নিয়ে টাঙ্গাইল জেলায় এসেছেন। খুলনার মহাজন দ্বৈরত নাথের মালিকানাধীন পালের রাখাল হয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একটি দলে চার থেকে ৫০০ প্রাণী থাকে। খালবিল, সমভূমি বা উঁচু ভূমিতে চষে বেড়ান। কচুঘেচু, ঘাস লতাপাতা ও পোকামাকড় খাইয়ে পালন করেন। মুসলিমদের নিকট শূকর নোংরা ও হারাম প্রাণী। উচ্চ ও মধ্য বর্ণের হিন্দুর কাছে শূকর ঘৃণিত না হলেও রমেন্দ্ররা অচ্ছুত্, অস্পৃশ্য ও ছোটজাত। সব মিলিয়ে হারাম প্রাণী লালনপালন এবং নিম্নজাত ও অচ্ছুত্ হওয়ায় ওদের মতো অন্ত্যজরা সর্বত্র ঘৃণিত ও অধিকার বঞ্চিত।
রমেন্দ্র জানান, পৈত্রিক সূত্রে তিনি শুধু দরিদ্র নয়, পশুপালনের পেশাটাও পেয়েছেন। পেটের দায়ে তার মতো অন্ত্যজরা মহাজনের পালের রাখাল হিসেবে কাজ করেন। তাদের সন্তানরা কেউ স্কুলে যায় না। তার দুই পুত্র এক মেয়ের কেউ পড়ালেখা করেনি। ছেলেরা শিশুকাল থেকেই মহাজনের পালের রাখাল। আর মেয়েকে বাল্য বিয়ে দিয়েছেন এক রাখাল জামাইয়ের কাছে। বিয়েসহ সকল সামাজিকতা আন্তঃসম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পাল নিয়ে বছরের দশ মাস বাইরে থাকতে হয়। মাসে বেতন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। খাওয়াপরা নিজের।
বেতন যা-ই হোক, রাখালের কাজটা খুবই কঠিন। রোদ, বৃষ্টি বা শীতে পাল নিয়ে মাঠেই থাকতে হয়। রাতে ঘুমাতে হয় অস্থায়ী ছাউনিতে। প্রচণ্ড বর্ষণেও কারো বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা হাটবাজারে ওঠা যায় না। ক্ষুধা লাগলেও কোনো হোটেল রেস্তোরাঁয় খেতে পারেন না। সামান্য চা পান করতেও যেতে হয় সবার অলক্ষ্যে রাতের বেলা। রমেন্দ্রের সঙ্গে পালে কাজ করেন সঞ্জিত আর বঙ্কিম। সঞ্জিত জানান, ছোট-বড় সবাই তাদেরকে তুইতুকারি করে। পালের প্রাণী অসাবধানবশত কারো সবজি বা ফসলি খেতে ঢুকলে নিস্তার নেই। গত ১৬ জুন মধুপুর উপজেলার পীরগাছা গ্রামে কচু খেতে পালের দুটি প্রাণী ঢুকলে গৃহস্ত নজরুল তেড়ে আসেন। প্রাণী দুটির সঙ্গে তাকেও পেটানো হয়। ফলে কয়েকদিন ধরে হাঁটাচলা করতে খুব কষ্ট হচ্ছে সঞ্জিতের। তার বক্তব্য, অনেকেই পালের প্রাণী আর তাকে একই সমান মাপেন। তাই প্রাণীর কোনো ভুলে তাকেও শাস্তিটা পেতে হয় সমান সমান।
অপর সহকর্মী বঙ্কিম জানান, গত ১৪ জুন ধনবাড়ী উপজেলার ভাইঘাট এলাকায় পাকা সড়কে পালের প্রাণীরা বিষ্ঠা ত্যাগ করার অপরাধে কান ধরে ১০০ বার উঠবস এবং নাকে ছেঁছুড় দেওয়ান এলাকার কয়েক যুবক। ‘ওরা সবাই ছিল আমার ছেলের বয়সী। ওদেরকে সেটা বলতেই হাসাহাসি শুরু করে। বলে, শূকরওয়ালারা কখনো মানুষের বাপ হয় না।’ রমেন্দ্র জানান, কোথাও পাল নিয়ে অবস্থানকালে রাতে চোরবাটপার ও ছিনতাইকারিদের অত্যাচার চলে হরহামেশা। গ্রামগঞ্জের মানুষের ভ্রান্ত ধারণা পালের প্রাণী পেটালে রোগমুক্ত হওয়া যায়। এজন্য জনপদ পেরোনোর সময় যুবক ও শিশুরা লাঠি হাতে পালের প্রাণীকে নির্দয়ভাবে পেটায়। এ ব্যাপারে গোপালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার আলীম উর রাজী জানান, পশু পেটালে কারো রোগ ভালো হয় না। এটি কুসংস্কার।
বেসরকারি সংস্থা সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট এ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড) এসব প্রান্তজনের ওপর সম্প্রতি জরিপ চালান। জরিপে বলা হয়, যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায় প্রায় ১৩ হাজার কায়পুত্রের বাস। এ ছাড়াও পাবনা ও সিরাজগঞ্জেও কিছু কায়পুত্র রয়েছেন। সেড এর পরিচালক ফিলিপ গাইন জানান, বিগত দশ বছরে ঐসব এলাকার প্রায় চার হাজার কায়পুত্র পেশা পরিবর্তন করে জেলে পেশাকে গ্রহণ করেছেন। বিখ্যাত লেখক ড. হরিশঙ্কর জলদাস ইত্তেফাককে জানান, এদেশে বাঙালি ছাড়াও অনেক জাতিসত্ত্বা ও জনগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন, যারা দরিদ্র, প্রান্তিক ও অধিকার বঞ্চিত। কায়পুত্ররা এদের অন্যতম। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘দ্যা লোয়ার ডেপথস’ নাটকের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে গুরুত্বহীন এসব মানুষ হিন্দু বর্ণাশ্রম অনুসারে শুদ্রেরও নিচে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং পিপিআরসি এর নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান জানান, ‘কায়পুত্ররা দরিদ্র, প্রান্তিক ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী বলে তাদেরকে ব্রাত্যজন বলা যায়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে দেশের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা।’
