দক্ষিণাঞ্চলে জ্বালানি সংকট হুমকির মুখে সুন্দরবন

আপডেট : ২৩ জুন ২০১৯, ২২:০২

দাকোপ (খুলনা) সংবাদদাতা

দিন দিন খুলনার দাকোপেসহ গোটা দক্ষিণ অঞ্চলে জ্বালানি সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলের মানুষ কাঠ ও গোবরের ঘুটা দিয়ে জ্বালানি সমস্যা সমাধান করে আসছে। কিন্তু অধিকহারে বৃক্ষ নিধন, গবাদিপশু পালনের স্বল্পতার কারণে চাহিদা অনুপাতে বর্তমান জ্বালানি সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিকল্প হিসেবে খড়কুটা, গাছের পাতার ব্যবহার বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। সম্প্রতি এ অঞ্চলে কয়েকটি এলপিজি ফিলিং প্লান্ট হলেও গ্যাসের অনেক দাম হওয়ায় এবং কয়লার যোগান না থাকায় অতিরিক্ত চাপ পড়ছে সুন্দরবনের উপর। ফলে সুন্দরবনও দ্রুত বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালে সিডর ও ২০০৯ সালে আইলা আঘাত হানার পর সুন্দরবনসহ দক্ষিণাঞ্চলে বৃক্ষের মারাত্মক ক্ষতি সাধন হয়। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জমিতে লবণ পানি আটকে চিংড়ি চাষ, চোরা কাঠ ব্যবসায়ী দ্বারা কাঠ পাচার ও গাছের বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ের কারণে ব্যাপকহারে বৃক্ষ সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। ফলে বৃক্ষ নির্ভর জ্বালানি সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করছে। উপজেলা সদর চালনা বাজার, বাজুয়া, বানিশান্তা, কালিনগর ও নলিয়ান বাজারে প্রতি মণ ১৮০ থেকে দুশ টাকা দরে জ্বালানি কাঠ বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি এ অঞ্চলে কয়েকটি এলপিজি ফিলিং প্লান্ট হলেও গ্যাসের দাম অতিরিক্ত হওয়ায় দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষের পক্ষে ক্রয় করা খুবই দুঃসাধ্য। তাই নদীর তীরবর্তী দরিদ্র মানুষেরা নদীতে ভেসে আসা কাঠের টুকরো সংগ্রহের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেমে পড়ে নদীতে।

এদিকে জ্বালানির উচ্চমূল্যের সুযোগে চোরা কাঠ ব্যবসায়ীরা বন বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে প্রায়ই সুন্দরবন থেকে হাজার হাজার মণ কাঠ নদী ও সড়কপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার করছে। এছাড়া অবৈধভাবে যত্রতত্র গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলোতেও কাঠের যোগান দিচ্ছে এ চোরা  কাঠ ব্যবসায়ী চক্র। এমনিভাবে চলতে থাকলে প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবন অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে বলে সচেতন মহল মনে করেন। কামনিবাসী এলাকার নারায়ণ মণ্ডল জানান, আমি গরীব মানুষ, গ্যাসের অনেক দাম। তাই কিনতে পারি না। এমনকি জ্বালানি কাঠও কিনতে পারি না। তাই জ্বালানির অভাবে আমরা স্বামী-স্ত্রী মিলে নদীতে নেমে ভেসে আসা কাঠের টুকরো সংগ্রহ করি। প্রতি গোনে ৮ থেকে ১০ মণ কাঠ ধরি এবং তা শুকানো হলে অনেক কমে যায়। সারাবছর এভাবে অতিকষ্টে জ্বালানি কাঠের সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়। তার মতো ওই এলাকার প্রায় শতাধিক লোক এভাবে জ্বালানির সমস্যা মোকাবেলা করে আসছে বলে তিনি জানান।

চালনা বাজারের কাঠ ব্যবসায়ী নাসিমা বেগম বলেন, জ্বালানি কাঠের সংকট দিন দিন বাড়ছে। মাঝে-মধ্যে উত্তর অঞ্চল থেকে কার্গো জাহাজে করে জ্বালানি কাঠ আসে তাই কিনে বিক্রি করি। তাছাড়া বিভিন্ন এলাকা থেকে সিরিশ গাছসহ হরেক রকম গাছ কিনে জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করে আসছি। চালনার গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ী ছলেমান মুন্সি জানান, ১২ কেজি ওজনের বিভিন্ন গ্যাস প্রতি সিলিন্ডার ৯৫০ থেকে ৯৮০ টাকায় বিক্রি করেন। প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি গ্যাস বিক্রি হয় বলে তিনি জানান।

সুতারখালী স্টেশন কর্মকর্তা মো. দাউদ মিয়া বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতমাসে সুন্দরবনের ভিতর থেকে চোরাদের কাটা বেশ কিছু কাঠ উদ্ধার করেন। এ ব্যাপারে তিনি বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি মামলাও করেন বলে জানান।