রোস্টন চেজের বলটা কাট করেছেন। বল পয়েন্টের ফিল্ডারকে পাশ কাটিয়ে বাউন্ডারির পানে এগুতে দেখেই ছুটতে থাকা মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ মুষ্টিবদ্ধ হাত শূন্যে ছুড়েছেন। তারপরের দৃশ্যটুকু তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি উদযাপনের। সেখানে বাড়তি কোনো রঙ নেই। প্রান্ত বদল করে এসে সাবলীলভাবেই সতীর্থ তাইজুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরেছেন। তবে শেষ দৃশ্যে আবার চিরচেনা মাহমুদউল্লাহকে দেখা গেছে। উইকেটের পাশে বসে সেজদাহ করেছেন, ফ্লাইং কিস ছুড়েছেন ড্রেসিংরুমের দিকে।
তবে এমন উদযাপন অবশ্য এই সেঞ্চুরির পথে মাহমুদউল্লাহর সংগ্রাম, ধৈর্য, অপেক্ষা, শৃঙ্খলিত ব্যাটিংয়ের ছবিটা প্রকাশে অক্ষম। শুক্রবার চা’র বিরতির পর ব্যাটিংয়ে নেমেছিলেন। দিন শেষে অপরাজিত ছিলেন ৩১ রানে। গতকাল নতুন করে ইনিংস শুরুর পরও ব্যাটিংয়ে ছিল দৃঢ়চেতা মনোবলের ছাপ। স্ট্রোকমেকার তথা শটস খেলা ব্যাটসম্যান হিসেবেই মাহমুদউল্লাহর পরিচিতি বেশি। কিন্তু এই সেঞ্চুরিতে ব্যতিক্রমী চরিত্র হয়েই ধরা দিয়েছিলেন তিনি।
কারণ তিন অঙ্কের ঘর স্পর্শ করার আগে প্রতিপক্ষকে কোনো সুযোগই দেননি। কয়েকবার তার বিরুদ্ধে রিভিউ নিয়েও সফল হয়নি ক্যারিবিয়ানরা। একবারই ক্যাচ দিয়েছেন ৩৭৬ মিনিট স্থায়ী ইনিংসে। সেটিও আউট হওয়ার দুই বল আগে। গতকাল ৮০’র ঘরে যাওয়ার পর ২০ রান তুলতে খেলেছেন ৬৩ বল। নার্ভাস নাইনটিজেও ৩০ বল খেলেছেন। ২০৩ বলে যখন সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তখন চার মেরেছিলেন মাত্র ছয়টি। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হওয়ার আগে নামের পাশে ১৩৬ রান (১০ চার)। এটি টেস্টে তার ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস। এর আগে সর্বোচ্চ ১১৫ রান ছিল নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে, ২০১০ সালে।
সেটিই তার ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি। দ্বিতীয় সেঞ্চুরি পেতে মাহমুদউল্লাহকে অপেক্ষা করতে হয়েছে আট বছর। গত নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে অপরাজিত ১০১ রান করেছিলেন। দুই সপ্তাহের ব্যবধানেই পেয়ে গেলেন তৃতীয় সেঞ্চুরি।
গতকাল দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদউল্লাহ জানালেন, মানসিকতার বদলেই ব্যাটিংয়ে এমন পরিণত ছাপ এসেছে। ১৩৬ রানের ইনিংসে ২৪২ বল খেলেছেন তিনি। যা তার ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ বল খেলার রেকর্ড। ৬৬টি সিঙ্গেলস নিয়েছেন।
টানা তিন টেস্টে দুই সেঞ্চুরি করা মাহমুদউল্লাহ বলেছেন, ‘পরিবর্তন বলতে আমি মানসিকভাবে কিছুটা পরিবর্তন এনেছি। আমি চিন্তা করেছিলাম, যেভাবে আমি ওয়ানডে ও টি- টোয়েন্টিতে ব্যাটিং করি, আমার ব্যাটিংয়ের সঙ্গে ওই মেজাজটাই যায়। আমি চাচ্ছিলাম যে শুরু থেকেই পজেটিভ থাকব। যদি মারার বল প্রথম বলেই পাই, আমি সেটা মারব। আমার মানসিকতা ওইরকমই ছিল। সেটা বলছিলাম, আমাকে কষ্ট করেই ব্যাট করতে হয়েছে।’
নার্ভাসনাইটিজে গিয়ে কিছুটা নার্ভাসও হয়ে পড়েছিলেন ৩২ বছর বয়সী এ ব্যাটসম্যান। পরে তাইজুলের কথায় ধৈর্য ধরেই এগিয়েছেন। তবে মিরপুরের উইকেটে ব্যাটিংটা সহজ ছিল না বলেই রায় দিলেন মাহমুদউল্লাহ। গতকাল তিনি বলেছেন, ‘উইকেটে বল খুব যে ব্যাটে আসছিল এমন ছিল না। কষ্ট করে ব্যাট করতে হয়েছে। গতকাল (শুক্রবার) বিকালের দিকে, দুইটা কি তিনটা বাউন্ডারি হয়েছে। সাকিবও বেশ কষ্ট করে ব্যাট করছিল। এই জিনিসটাই, পজেটিভ থাকব কিন্তু সহজেই যেন ভুলটা না করি। এটাই মৌলিক পরিকল্পনা ছিল। এর বাইরে তেমন কিছু নিয়ে আমরা চিন্তা করিনি।’ নিজের তৃতীয় সেঞ্চুরিটা মাকে উত্সর্গ করেছেন মাহমুদউল্লাহ। সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সেঞ্চুরি উদযাপনে সেই ফ্লাইং কিসটা ছুড়েছিলেন স্ত্রী ও সন্তানদের উদ্দেশে।
সাত নম্বরে নেমে মাহমুদউল্লাহর আগে বাংলাদেশের হয়ে সেঞ্চুরি আছে মুশফিকুর রহিম ও নাসির হোসেনের। ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে আরও অর্জনের ভারে সমৃদ্ধ হবেন অভিজ্ঞ এ ব্যাটসম্যান।
