মধ্যবিত্ত বাঁচবে কীভাবে?

আপডেট : ২৩ জুন ২০১৯, ২২:১২

প্রতি বছর বাজেট ঘোষণা করার পরই ভালো-মন্দ নানারকম সমালোচনা শুরু হয়ে যায়। আমি বাজেট বিশারদ নই। তাই বাজেট ভালো হয়েছে না মন্দ হয়েছে— এ নিয়ে মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমার নেই। তবে সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর অধিক হারে উেস কর কাটার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর সমূহ বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে আমার মনে হয়।

২০১৬ সালের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের উেস কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছিল। তাই সাধারণ মানুষ আশা করতেই পারে, চাকরিজীবীদের যেখানে বেতনস্কেল এত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে পুরনো স্কেলে অবসরপ্রাপ্তদের অন্তত পরিবার সঞ্চয়পত্র বা পেনশনার সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বাড়িয়ে দিয়ে উেস কর বাতিল করে একটা সমন্বয় করে দেওয়া  হবে।

অতীতে দেখা গেছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনস্কেল বাড়ানোর ঘোষণা দিলেই বাজারদর বেড়ে যায়। সামান্য কটা টাকা বাড়ালেই বাজারদর নাগালের বাইরে চলে যায়। বর্তমানে বেতন স্কেল অনেক বেশি বেড়ে গেছে। তাই বাজারদরও একইভাবে বেড়ে চলছে। শুধু কি বাজারদর? বিদ্যুত্ বিল, গ্যাস বিল, পানির বিল সমান তালে বেড়ে চলছে; কিন্তু মধ্যবিত্তদের পুরনো স্কেলের টাকার পরিধি তো বাড়ছে না? এত অল্প টাকায় এদের পক্ষে ভদ্রজনোচিতভাবে টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।

বর্তমানে মধ্যবিত্তের মধ্যে যাদের বেতন স্কেল হু হু করে বেড়ে চলেছে, কালক্রমে তাদের মধ্যে অনেকেই উচ্চবিত্তে নাম লেখাতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস; কিন্তু মধ্যবিত্তের মধ্যে যারা পুরনো স্কেলে অবসরে গেছেন, তাদের ক্রমেই নিম্নমধ্যবিত্তে নেমে যাওয়ায় সম্ভাবনা রয়েছে।

পুরনো স্কেলের এইসব মধ্যবিত্ত নাগরিক এখন সবাই প্রবীণ। এদেরকে গালভরা ‘সিনিয়র সিটিজেন’ বলে সম্বোধনও করা হয়। উন্নত দেশগুলোতে এই সিনিয়র সিটিজেনদের নানারকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। আমাদের দেশে ওইসব সুযোগ-সুবিধা রাতারাতি দেওয়া সম্ভব নয়; কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, আজকের দিনে যারা প্রবীণ, তারা এক সময়ে নবীন ছিলেন। তারাই তাদের মেধা-শ্রম-শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে দেশকে গড়েছেন। মুক্তিযুদ্ধেও এরা কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন। এদের অবদান রুধির-ধারার মতো দেশের মাটির সঙ্গে মিশে থাকবে। সেদিন বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে মধ্যবিত্ত শ্রেণিও দেশ স্বাধীন করার প্রত্যয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। দেশে আজ উন্নয়নের জোয়ার এসেছে। অত্যন্ত আনন্দের বিষয়— আমাদের দেশ আজ নিম্ন আয় থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হচ্ছে। ষাটোর্ধ্ব সিনিয়র সিটিজেনদের আনন্দে যাতে ভাটা না পড়ে, সেদিকে অবশ্যই নজর রাখতে হবে।

এক সময় সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের জন্য উত্সাহিত করা হতো। কারণ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা বেশি এবং নিরাপদ। বেশির ভাগ অবসরপ্রাপ্তরা সারা জীবন সত্পথে থেকে নির্ধারিত আয়ের টাকা অল্প অল্প করে জমিয়ে এর সঙ্গে অবসরের সমুদয় অর্থ দিয়ে পরিবার সঞ্চয়পত্র বা পেনশনার সঞ্চয়পত্র ক্রয় করতেন, যাতে লভ্যাংশের টাকায় ছেলেমেয়ে, পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার চালাতে পারেন। তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন এই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমিয়ে দিলে তারা মৌলিক চাহিদা অন্ন-বস্ত্র-চিকিত্সা-বাসস্থানের অভাব মেটাতে পারবেন না। ফলে তাদের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। স্বাভাবিকভাবেই প্রবীণ বয়সে যেমন রোগ-বালাই বেশি হয়, তেমনি ওষুধ, ডাক্তারের খরচও অনেক বেশি হয়।

সাধারণত প্রবীণ বয়সেই কারো কারো হাঁটু ব্যথা, কোমর ব্যথা নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। তাই যাদের গাড়ি ব্যবহার করা প্রয়োজন, তাদের ড্রাইভারের বেতনের সঙ্গে সঙ্গে তেল-গ্যাসে প্রচুর টাকা খরচ হয়ে যায়। এখন মধ্যবিত্ত প্রবীণদের বিষয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। সারা জীবনের সঞ্চয়ের টাকাই যদি এমনিভাবে কমে যায়, তাহলে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়বে। দেশ গঠনে নিবেদিতপ্রাণ অবসরপ্রাপ্তদের প্রতি এখনই নীতি-নির্ধারকদের নজর দিতে হবে। অন্যথায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকা কমতে কমতে একপর্যায়ে এসব মধ্যবিত্তকে পথে বসতে হতে পারে।

২০১৫ সালের বাজেট আলোচনায় তত্কালীন মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী অত্যন্ত গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন যে, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোয় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও কর্মচারী। তাই তিনি ২০১৫ সালে বাজেট আলোচনা তত্কালীন মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার না কমানোর জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তিনি তখন তাঁর আলোচনায় আরো উল্লেখ করেছিলেন, শেখ হাসিনার সরকার, জনগণের সরকার, জনগণের কল্যাণ হয়, এমন কাজ করাই এই সরকারের নীতি। তাঁর কথায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে যেসব প্রবীণ চলেন, তারা আশায় বুক বেঁধেছিলেন হয়ত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমবে না; কিন্তু এবারের বাজেটেও সঞ্চয়পত্রের উেস কর বৃদ্ধির পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। তাই এবারও অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী এমপির অগ্নিঝরা বক্তব্যটিও যথাযথ এবং সময়োপযোগী হয়েছে।

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সন্তানদের বেহাল দেখে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারিকদের যেভাবেই হোক, এদের হাতে সুফল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। মধ্যবিত্তদের বাঁচার জন্য এবং ভালোভাবে টিকে থাকার জন্য একটা না হয় একটা পথ খুঁজে বের করতেই হবে।

n লেখক: প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ; প্রাক্তন অধ্যক্ষ, আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ