শুরুতেই পাঁচ গুণ বেড়েছে ডেঙ্গু

আপডেট : ৩০ মে ২০২৩, ০৬:০২

এডিস মশার প্রজনন মৌসুমের শুরুতেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সংখ্যার দিক থেকে গত বছরের প্রথম ‘পাঁচ মাসের’ তুলনায় পাঁচ গুণ । এতে স্বাস্থ্য বিভাগ উদ্বিগ্ন। গত বছর এই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু শূন্য থাকলেও এবার তা ১৩ জন। এবার শুধু রাজধানী নয়, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন শহর এবং গ্রামাঞ্চলও ডেঙ্গুর হটস্পট হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী।

সাধারণত বর্ষাকালকে ডেঙ্গুর মৌসুম বলা হয়। কারণ বৃষ্টির পানি বিভিন্ন স্থানে জমে থাকে। আর এই প্রাদুর্ভাব চলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তাই এই সময়টাকে ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশার প্রজননকাল ধরে নেওয়া হয়। তবে এবার প্রজননের মৌসুমের শুরুতেই ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, এখন এমন অনেক জায়গায় এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে বৃষ্টির পানির সম্পর্ক নেই। এর মধ্যে বহুতল ভবনের পার্কিংয়ের জায়গা, নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্ট, ওয়াসার মিটার বাক্স এবং বাসাবাড়িতে জমিয়ে রাখা পানি রয়েছে। রাস্তা উঁচু করার ফলে নিচু হয়ে যাওয়া বাসাবাড়ির জমা পানিতেও এডিস মশা জন্ম নিচ্ছে। এ কারণে এবার দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, আমরা মতামত দিচ্ছি, কিন্তু তা সংশ্লিষ্টরা শুনছেন না।  যার কাজ সে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করলে দেশে ডেঙ্গুর পরিণতি হবে ভয়াবহ। এখন বছরের ১২ মাসেই ডেঙ্গু হচ্ছে। সব বয়সির মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে শিশুদের আক্রান্তের হার এখন বেশি। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে চিহ্নিত শত্রু এডিস মশা মারার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সবার সচেতন হতে হবে। যারা দায়িত্বে অবহেলা করবে তারাই ডেঙ্গু বৃদ্ধির জন্য দায়ী থাকবে।

ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ার চিত্র তুলে ধরে দেশবাসীকে এডিস মশাবাহিত এই রোগ থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ডেঙ্গু বেড়ে গেছে। এ বছর মে মাসের এ পর্যন্ত ১ হাজার ৮৪৩ ডেঙ্গু রোগী আমরা পেয়েছি। মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের। এবং আমরা যদি গত বছরের সঙ্গে তুলনা করি, এই বছর রোগীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ গুণ, গত বছরের তুলনায়। অর্থাৎ অনেক রোগী বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বিষয়ে আমরা, আমাদের অধিদপ্তর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

সোমবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নেওয়া পদক্ষেপের অংশ হিসাবে হাসপাতাল পরিচালকদের সঙ্গে সভা করার পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু সার্ভে চলমান আছে। আমরা সেই সার্ভে রিপোর্টটা দুই সিটি করপোরেশনকে দিয়েছি। হাসপাতালে আলাদা কর্নার ও ওয়ার্ড তৈরি করা হচ্ছে। এবং সে বিষয়েও আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি।’

 স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সোমবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৭২ জন এডিস মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন; তাদের মধ্যে ৫৮ জনই ভর্তি হয়েছেন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে, ঢাকার বাইরে নতুন রোগী মিলেছে ১৪ জন। আর এ বছর সব মিলিয়ে ১ হাজার ৮৪৩ জন ডেঙ্গু নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ২৩৫ জন ঢাকায় এবং বাকি ৬০৮ ঢাকার বাইরের। অবশ্য যারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও পরীক্ষা করাননি বা হাসপাতালে ভর্তি হননি, তাদের তথ্য এ পরিসংখ্যানে আসেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এবার ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ হয়ে উঠেছে।  গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৮১ জনের মৃত্যু হয়। এটাই এযাবত্কালের সর্বোচ্চ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু হয় এডিস মশার কামড়ে। যেহেতু আমরা শত্রু চিনি, তাই এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শত্রু নির্মূল করতে হবে। শুধু এক পক্ষকে দোষারোপ করলে হবে না। পরিবারের লোকদেরও সচেতন হতে হবে। নিজে সচেতন না হলে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নেবে। এখন শহর থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ডেঙ্গু ছড়িয়ে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ। তিনি বলেন, জ্বর হলে অবহেলা না করে আগে ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে হবে। সব ডাক্তারদের ডেঙ্গু ও করোনা সম্পর্কে ধারনা আছে। শুরুতে কোন ধরনের এন্ট্রিবায়োটিক বা ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না। শুধু প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শে চলতে হবে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. নাজমুল হক বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য হাসপাতালগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে রোগী ব্যাপক হারে বাড়লে পরিস্থিতি খারাপ হবে। তাই রোগী যাতে না বাড়ে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা একজনের পক্ষে সম্ভব না। যার যে কাজ সেটা সঠিকভাবে পালন করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

এদিকে ডেঙ্গুর পাশাপাশি করোনা রোগীও বাড়ছে। দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ১৫৯ জন কোভিড রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।  এর আগে সর্বশেষ গত বছরের ২৬ অক্টোবর ১৯৬ জন রোগী শনাক্তের খবর এসেছিল। এরপর থেকে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দেড়শর নিচেই ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, রবিবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৩ হাজার ৯৯টি নমুনা পরীক্ষা করে ঐ ১৫৯ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, যারা ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদরোগ, ক্যানসার ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত তারা যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন। মাস্ক পরলেই হবে।

এ সপ্তাহ থেকে ফাইজারের নতুন টিকায় বুস্টার ডোজ: এক বছরের বেশি সময় পর আবার কোভিড টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়া শুরু করছে সরকার। ফাইজারের নতুন ভ্যারিয়ান্টি কনটেইনিং ভ্যাকসিনে (ভিসিভি) তৃতীয় ও চতুর্থ বুস্টার ডোজ প্রয়োগ শুরু হবে এই সপ্তাহেই। কোভ্যাক্সের আওতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকে ফাইজারের এই টিকার ৩০ লাখ ডোজ পেয়েছে সরকার। সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘এই টিকাটি নতুন উদ্ভাবিত টিকা এবং বিভিন্ন দেশে দেওয়া হচ্ছে। বুস্টার ডোজ হিসেবে আমরা এই টিকাটি দেব। আমরা প্রায় ৩০ লাখ ডোজ টিকা ইতিমধ্যে পেয়েছি। যাদের বয়স ১৮ বছরের বেশি তারা তৃতীয় ডোজ পাবে। আর ক্রনিক রোগী যারা তারা, যাদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা নেই, গর্ভবতী মায়েদের এবং সম্মুখ সারির যোদ্ধা যারা চতুর্থ ডোজ পায়নি, তাদেরকে টিকা দেওয়া হবে। ডব্লিউএইচও এই টিকার অনুমোদন দেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের দেশে আমাদের টিকাদানের জাতীয় কারিগরি কমিটি, তারও অনুমোদন ও মতামত রয়েছে। আমাদের ওষুধ প্রশাসনেরও অনুমোদন রয়েছে।

ইত্তেফাক/ইআ