কিছুদিন আগে আমি আর আমার বোন লোকাল বাসে করে ফিরছিলাম। আমার বোন বারবার খেয়াল করছিল একটা লোক হা করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটার দৃষ্টি অস্বস্তি লাগছিল। আমরা বাঙালি পোশাকেই ছিলাম। অদ্ভুতভাবে সাজিনি। আমার বোন সহ্য না করতে পেরে জোরে চিত্কার করে বলে উঠলো ‘আপনি তাকাই আছেন কেন’! লোকটা এমনভাবে আশ্চর্য হলো যেনো কিছুই করেনি। আমার বোনের চিত্কারে বাসে থাকা বাকিরা অবাক, তারা মুখফসকে কিছু না বললেও বোঝা যাচ্ছে তারা আমার বোনের চিত্কারকে অহেতুক ভাবছে।
এটা যে শুধু আমাদের বেলায় তা কিন্তু নয়, আমি এর আগে আরো কয়েকজন মেয়ের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি তারা লোকাল যানবাহন বা রাস্তাঘাটে, কর্মসংস্থানে হয়রানির শিকার হওয়ার পর যখন প্রতিবাদ করেছে তখন আশপাশের মানুষ ইভটিজারের পক্ষ নিয়ে ভিকটিমকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেছে অথবা দেখেও না দেখার মতো করে এড়িয়ে গিয়েছে।
আমরা যে প্রতিবাদ নুসরাতের মৃত্যুর পর করেছি তা যদি সে জীবিত অবস্থায় তার পাশে দাঁড়িয়ে করতাম, তাহলে আজ নুসরাত জীবিত থাকতো। আমরা ঝামেলা এড়ানোর জন্য ঠিকই সব এড়িয়ে গিয়েছি।
আর এরাই হচ্ছে সে মানুষগুলো যারা রাস্তাঘাটে, যানবাহনে, কর্মস্থলে একজন মেয়েকে হয়রানির শিকার হতে দেখেও চুপ থাকে, এরাই তারা যারা অপরাধীর পক্ষ নিয়ে ভিকটিমকে অকথ্য ভাষায় কথা বলে। একের পর এক ধর্ষণ এবং খুনের পর আমরা প্রতিবাদ সমাবেশ করার কিছুদিন পরেও আবার একই অপরাধ সংঘটিত হয়। এরজন্য কি আমরা দায়ী নই? কয়েকদিন আগে ফেসবুকে দেখলাম একদল লোক একজন তারকার সহধর্মিণীকে নিয়ে নোংরা নোংরা কমেন্টস করছে। তা দেখে আরেক দল লোক এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লো সঙ্গে সঙ্গেই নোংরা কমেন্টসকারীরা কমেন্টস ডিলেট করতে বাধ্য হলো। আপনি হয়তো ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিলেন মেয়েটা আপনার প্রিয় তারকার সহধর্মিণী বলে। ঠিক এভাবেই আসুন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বাস্তব জীবনে প্রতিটা মা জাতির অপমানে প্রতিবাদ করে পাশে দাঁড়াই।
কিন্তু বর্তমানে অন্যায়গুলোর সময় যখন আমাদের যুবকদের মুখলুকিয়ে থাকতে দেখি, তখন ভাবি তবে কি আমরা নপুংসকের যুগে বাস করছি! এসব লেখা-লিখার সময় অনেকেই অনেকের ফারেন্স বা বাত্সরিক পার্সেন্টেজ উল্লেখ করে; কিন্তু আমি তা করবো না। কারণ আমি জানি আমি যখন এই লেখাটা লিখছি তখনই হয়তো আরো একজন নুসরাত একা একা লড়াই করতে গিয়ে মৃত্যুরদিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এর মানে প্রতিনিয়ত এর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে যা পার্সেন্টের হিসেবের আড়ালে। কিছু ঘটনা এমনভাবে হয় যা আমরা জানতেই পারি না। আর ভিকটিমের দিকে অপবাদ দেওয়াকেই আমরা ভাবি সমাজের ভয়! যার কারণেই আড়ালে থেকে যায় অনেক ঘটনা। এসব কিছুর জন্য দায়ী আমাদের চুপ থেকে ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়ার নামে প্রতিবাদ থেকে বেঁচে যাওয়ার প্রবণতা।
n লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
