বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, বাজেটের ফলাফল নিয়ে আলোচনা করতে হবে। বাজেটে কত ব্যয় হলো, কত বরাদ্দ হলো আমরা শুধু সেসব বিষয়ে আলোচনা করি। কিন্তু বাজেটের সুফল কতটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাল সে বিষয়ে আলোচনা হয় না। দেশে অসমতা বাড়ছে, বৈষম্য বাড়ছে—এ বিষয়গুলো নিয়ে বাজেট প্রস্তাবনায় কিছু নেই। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, আমরা দেখতে পাই চট্টগ্রামের একজন ব্যবসায়ীকে ব্যাংক থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, অথচ এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে দেশের ৫ লাখ মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নিয়ে আসা সম্ভব। দেশে ব্যাপক দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে, এটা প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে সঙ্গে আয় বৈষম্যও বেড়েছে। বেড়েছে সামাজিক বৈষম্য। আমরা ভর্তুকি দিচ্ছি, করে ছাড় দিচ্ছি আবার ব্যাংকের ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিচ্ছি। এই ধরনের সুবিধার কারণেই সমাজে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর একটি হোটেলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সংলাপে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক রেহমান সোবহান একথা বলেন। প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে উপস্থাপনা পেশ করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আরো বক্তব্য দেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান, সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান, রুমিন ফারহানা, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, অধ্যাপক বরকত এ খোদা প্রমুখ।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের সমালোচনা করে বলেন, আপনারাই বইয়ে পড়ান, উন্নয়নের পথে বৈষম্য তৈরি হয়। কিন্তু এই ধরনের বৈষম্য দূর করতে বাজেটের মাধ্যমে বিশাল সামাজিক নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছে। এমন কোনো সমাজ নেই যেখানে বৈষম্য নেই। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য দারিদ্র্য দূরীকরণ। এজন্য আমরা অবকাঠামো, বিদ্যুত্, শিক্ষাসহ সামাজিক নিরাপত্তায় গুরুত্ব দিয়েছি। অর্থনীতিতে বাজার ব্যবস্থায় চাহিদার আলোকে বরাদ্দ দেওয়া হয় উল্লেখ করে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বাজার প্রভুর চাহিদা অনুযায়ী অর্থনীতিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
তার এই বক্তব্যের সমালোচনা করে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বাজার প্রভু কারা? ওরাই বাজার প্রভু যারা সংসদে আছেন, ব্যবসায় আছেন, রাজনীতিতে আছেন। যারা ভোট চুরি করে ক্ষমতায় বসে আছেন। এই চক্রের মধ্যেই বসে আছে বাজার প্রভু। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির বিষয়টি রাজনৈতিক ভাবে বলা হচ্ছে। ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলো এক ধরনের বুদবুদ। প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি বিনিয়োগ। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী ৫ বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দেশে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও এসেছে মাত্র ৭ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানিও লক্ষ্য অনুযায়ী অর্জিত হয়নি। আমাদের সময়ে শেয়ারবাজারে জিডিপির ২২ ভাগ বাজার মূলধন থাকলেও এখন সেটি ১৭ শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, উন্নয়নের কথা বলা হয়, কিন্তু ৬ ডলারের গ্যাস ৯ ডলারে কিনছে সরকার। মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। মেগা প্রকল্পের দুর্নীতি ও ব্যাংকের টাকা একটি চক্রের হাতে চলে যাচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেট ব্যবসাবান্ধব নয় উল্লেখ করে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান বলেছেন, নতুন বাজেট ব্যবসায়ীবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব নয়। সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান বলেছেন, ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হচ্ছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা উধাও হয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতিবাজদের ধরতে ট্রাইব্যুনাল গঠনের আহ্বান জানান তিনি। সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি রুমিন ফারহানা বলেছেন, বাংলাদেশ এমন একটা দেশ, দরিদ্র ও ধনীদের মধ্যে যে বৈষম্য বাড়ছে, এটা কমানোর ব্যাপারে এই বাজেটে কিছুই বলা নেই।
