শেরপুরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক কীর্তিসমূহ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা, অজ্ঞতা এবং অনীহার কারণে পৌনে তিনআনি জমিদারদের দৃষ্টিনন্দন রংমহলটি প্রায় ধ্বংসের মুখে।
ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে পৌনে তিনআনির জমিদার কিশোরী মোহন চৌধুরীর আমলে অপূর্ব কারুকার্যময় এই রংমহলটিসহ আরও কয়েকটি ভবন এবং অন্নাপূর্ণা-গোপী নাথ মন্দির তৈরি করা হয়। সংস্কারের অভাবে এবং কালের করাল গ্রাসে সবগুলো স্থাপনাই বর্তমানে ধ্বংস হতে চলেছে।
অপূর্ব স্থাপনাগুলোর মধ্যে রংমহলটিই সবচেয়ে আকর্ষণীয়। উত্তর দক্ষিণে প্রলম্বিত রংমহলের প্রবেশ পথে তিনটি খোলা দরজা। ডান দিকের দরজা বরাবর টানা লম্বা করিডর। প্রশস্থ করিডরের বাম দিকে চারটি বড় বড় কক্ষ। করিডর ও ভবনের ভেতরের অর্ধেক দেওয়াল জুড়ে বিরাজ করছে রঙিন চীনা ফ্রেসকো ও ফুল লতাপাতা আঁকা টালির সাজ। সার্ধশত বর্ষ পরে আজো সেগুলোর উজ্জ্বল্য একটুও কমেনি। প্রতিটি কক্ষে ঢোকার দরজার পাশে ছিল পিতল ও পাথরের নানা ধরনের স্ট্যাচু আর বিরাট আকারের ফুলদানি। রংমহলের ডান পাশ ঘেঁষে বড় শান বাঁধানো পুকুর। পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে প্রতিবিম্বিত হয় রংমহল। পুকুরের সম্মুখ ভাগে ছিল বিশাল লাইব্রেরি ভবন। লাইব্রেরিতে ছিল পাঁচ সহস্রাধিক বইয়ের ভান্ডার। ওই ভবনের বারান্দায় ছিল চেয়ারে আসীন জমিদার কিশোরী মোহন চৌধুরীর স্ট্যাচু। রংমহলের পেছনেই ছিল জমিদার পরিবারের বাস ভবন। উত্তর দিকে জমিদার পরিবারের কুল-দেবতা অন্নাপূর্ণা-গোপীনাথের মন্দির, যা আজও জরাজীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে। সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এখনো নিয়মিত পূজাঅর্চনা করেন।
জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি এবং উপমহাদেশ বিভক্তির কারণে শেরপুরের জমিদারগণ সহায় সম্পত্তি ফেলে পঞ্চাশ দশকের শুরুতে দেশ ত্যাগ করেন। পৌনে তিনআনির জমিদার পরিবারও বিপুল সম্পত্তি ফেলে চলে যান। এর পরই শুরু হয় লুটপাটের রাজত্ব। খোয়া যেতে থাকে রংমহলের দামি আসবাবপত্র। এমন কি লাইব্রেরিাটও বইশূন্য করে ফেলা হয়।
ষাটের দশকে পৌনে তিনআনি জমিদারদের পরিত্যক্ত বাড়িতে গড়ে উঠে শেরপুর কৃষি প্রশিক্ষণালয়। রংমহলটি অধ্যক্ষের অফিস ও প্রশাসনিক কার্যালয় ব্যবহার শুরু হয়। রংমহলের পাশে সুদৃশ্য জয়কিশোর লাইব্রেরিটি ভেঙে সেখানে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাদানের জন্য গড়ে তোলা হয় টিনশেড শ্রেণিকক্ষ। কিন্তু দীর্ঘ দিন সংস্কারের অভাবে রংমহলটি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বর্তমান সরকারের আমলে আট কোটি টাকা ব্যয়ে রংমহলের বিপরীত দিকে অধ্যক্ষের অফিস, প্রশাসনিক ভবন ও পাঠদানের শ্রেণিকক্ষসহ তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনিস্টিটিউটের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কৃষিবিদ মো. সাইফুল আজম খান জানান, মোট ৪৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রংমহল ও অন্নাপূর্ণা-গোপীনাথজীর মন্দির রয়েছে। মন্দিরটিতে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় নিয়মিত পূজাঅর্চনা ও দেখভাল করেন। রংমহলটি এতো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে যে ভবনটিতে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন বলে জানান।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক সাহেলা আক্তারের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, ঐতিহ্যবাহী রংমহলসহ আরও কিছু পুরাকীর্তি সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ অচিরেই শেরপুর আসবেন।
